রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার বড়হারে কমে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৩.৬৭ শতাংশ—বিগত সাত বছরে এটি সর্বনিম্ন। গতবার এই হার ছিল ৭৭.৬৬ শতাংশ, যার সঙ্গে তুলনায় এক বছরে পাসের হার কমেছে প্রায় ১৩.৯৯ শতাংশপয়েন্ট।
পরিসংখ্যান ও চলমান চিত্র
এই বছরের পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে মোটভাবে নিবন্ধিত ছিলেন ১,৭৮,৯৫২ জন শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন ১,৭৬,৪৪৪ জন; অনুপস্থিত ছিলেন ২,৯০৮ জন। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন প্রায় ১,১২,০৮৬ জন—অর্থাৎ প্রায় ৬৪,৩৫৮ জন অকৃতকার্য হয়েছেন।
শতভাগ পাস বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে
ভিত্তিভিত্তিক ফলাফলে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন দেখা গেছে। গত বছর রাজশাহী বোর্ডে মোট ৯৯টি বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী পাস করলেও এবার এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমে এসেছে মাত্র ৩৫টিতে। অর্থাৎ এক বছরে শতভাগ পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৬৪টি।
- ২০২০ সালে শতভাগ পাসকারী বিদ্যালয় ছিল ৩০৮টি।
- ২০২১ সালে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে সংখ্যা ছিল ৩৬৮টি।
- ২০২২-২০২৪ সালে যথাক্রমে ১৪৭, ১৭৮ ও ২৮৯টি বিদ্যালয় শতভাগ পাস ছিল।
- ২০২৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৩৫টিতে নেমে এসেছে।
লিঙ্গভিত্তিক পারফরম্যান্স
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ভালো ফল করেছে। এবারের পাসের হার মেয়েদের জন্য হয়েছে ৭০.৭৩ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৭.৩৩ শতাংশ—অর্থাৎ মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে প্রায় ১৩.৪০ শতাংশপয়েন্ট এগিয়ে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিকেও ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি; মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬,১১৩ জন শিক্ষার্থী, যার মধ্যে অনেকেই ছাত্রী।
বোর্ড চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা ও নজরদারি
“সবাই তো ঠিকমতো পড়াশোনা করে না। পড়ে পাস করলে এরকমই ফলাফল হওয়ার কথা।”
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শামীম আরা চৌধুরী ফলকে এই ধাঁচেই দেখেছেন এবং সংখ্যার বদলে শিক্ষার গুণগত মানকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে বোর্ড প্রশাসনের মনোভাব প্রতিফলিত যে, পাসের হার যদি কমেও শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়ন সঠিক ভাবে হয়ে থাকে, তা কার্যত ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পেছনের কারণ: নীরব প্রত্যাশা ও প্রশ্ন
ফলাফলের এই কড়াভাবে পতন নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। গত কয়েক বছরে পাসের হার সাধারণত ৭৭ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে উঠ-ব নাম করলেও এইবার তা এককভাবে ৬৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। যদিও বোর্ড প্রশাসন গুণগত মানের উপর গুরুত্বারোপ করছেন, তবু প্রশ্ন থেকে যায়—পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি, স্কুল পর্যায়ের নীতিনির্দেশনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির সহায়ক পরিবেশ কেমন ছিল।
শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় শিক্ষক মহলের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসছে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ—কঠোরতর মূল্যায়ন নীতি, পরবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক চাপ, অনলাইন-অফলাইন ক্লাসের অনিয়মিত চলাচল, এবং কোভিড পরে শিক্ষাবিভাগীয় পুনরুদ্ধারের অসমপূর্নতা। তবে এগুলো যাচাই করে স্পষ্ট করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
স্থানীয় প্রভাব ও ভবিষ্যৎ করণীয়
পাসের হার হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়বে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি, কারিকুলাম সংশোধন এবং শিক্ষক উন্নয়ন প্রোগ্রামে। স্থানীয় পর্যায়ে স্কুল-কলেজগুলোকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, দুর্বল ছাত্রদের জন্য পুনরায় পাঠদান এবং মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করা হবে—এগুলোই সম্ভাব্য প্রয়োগযোগ্য পদক্ষেপ।
| বছর | পাসের হার | শতভাগ পাসকারী বিদ্যালয় |
|---|---|---|
| ২০২০ | ৯০.৭৯% | ৩০৮ |
| ২০২১ | ৯৪.৯১% | ৩৬৮ |
| ২০২২ | ৮৫.৮৮% | ১৪৭ |
| ২০২৩ | ৮৭.৮৯% | ১৭৮ |
| ২০২৪ | ৮৯.২৬% | ২৮৯ |
| ২০২৫ | ৭৭.৬৬% | ৯৯ |
| ২০২৬ | ৬৩.৬৭% | ৩৫ |
অবশ্য প্রত্যেক বছরের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, পাসের হার একক সূচক হিসেবে শিক্ষার পুরো চিত্র বলে না। তবু সংখ্যার এমন বড় পরিবর্তন স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। এখন সময় যত দ্রুত সম্ভব দুর্বল দিকগুলি শনাক্ত করে সহায়ক পরিকল্পনা গ্রহণের—বিশেষ করে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনর্বাসনমূলক পাঠদান ও শিক্ষক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজশাহী থেকেঃ প্রতিবেদক