পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবস্থিত শালবাহান তেলকূপ—একটি সময় ম্যাপ করা হয়েছিল দেশের সম্ভাব্য জ্বালানি উৎস হিসেবে। আজ সেটি ভুলে যাওয়া এক অধ্যায় নয়; বরং স্থানীয়দের দাবি ও তত্ত্বাবধায়ক সূত্রের প্রশ্নে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম উদ্বোধনের পর কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কূপটি সিল করে দেওয়ার ঘটনা প্রায় ৩৮ বছর পেরিয়েও নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত কারিগরি প্রতিবেদন জনসমক্ষে নেই।
শুরুটা কীভাবে হয়েছিল
১৯৮০-এর দশকে তেঁতুলিয়া—শালবাহান-জুগিগছ এলাকায় ভূকম্পন গবেষণা ও অন্যান্য জরিপের মাধ্যমে হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনার ইঙ্গিত আসে। এরপর অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়। কয়েকটি সরকারি পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও বিদেশি অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে প্রকল্পটি এগোত। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথাও আছে। সেই পর্যায়ে পরিকল্পনা ছিল গভীর কূপ খনন করে সম্ভাব্য তেল উত্তোলন করা; অর্থাৎ বিষয়টি স্থানীয় গুজব নয়, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও বহুজাতিক সহযোগিতায় শুরু হয়েছিল।
হঠাৎ বন্ধ হওয়ার রহস্য
সরবরাহিত তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধান ও পরীক্ষামূলক উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থা তাদের যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয়। পরে কূপটি স্থায়ীভাবে সিল করা হয়। এখানেই প্রশ্ন ওঠে: যদি প্রকল্পটি বাস্তবিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে অনুপযোগী ছিল, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা কারিগরি তথ্য ও ফ্লো টেস্টের ফলাফল কোথায়? সাধারণ মানুষের কাছে এসব রিপোর্ট আজও প্রকাশিত নয়।
স্থানীয়রা কি জানে, দাবি কী
স্থানীয়রা এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনকারী সূত্রে দাবি, প্রকল্প বন্ধ করার সময়কে কেন্দ্র করে সরকারি জানিয়েছেন যে “তেল নেই” — কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেই, কি তহবিল, কি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং কি উৎপাদনশীলতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, সম্ভবত পর্যাপ্ত পুনরায় জরিপ বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরায় যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
- প্রথম পর্যায়: ভূকম্পন ও উদ্বেগভর্তি সম্ভাব্যতা শনাক্ত।
- দ্বিতীয় পর্যায়: অনুসন্ধান কূপ খনন ও সূচনামূলক উত্তোলন।
- তৃতীয় পর্যায়: কার্যক্রম বন্ধ, যন্ত্রপাতি প্রত্যাহার ও কূপ সীল করা।
অন্তর্দৃষ্টি ও তথ্যের অনুপস্থিতি
একটি জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন জ্বালানি অনুসন্ধান প্রকল্প যেখানে সরকারি অর্থায়ন, বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিগত সম্পৃক্ততা ছিল—সেখানে যদি ফলাফল অনুপযোগী ধরা হয়, তবুও সেই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা নির্ধারণমূলক রিপোর্ট সাধারণের দৃষ্টি থেকে গোপন রাখা হলে সন্দেহ ও আক্ষেপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষত বর্তমানে দেশীয় ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তীব্র।
| বছর/পর্যায় | ঘটনার সারমর্ম |
|---|---|
| ১৯৮০s | ভূকম্পন জরিপ ও হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনা শনাক্ত |
| ১৯৮৮ | উদ্বোধন ও অনুসন্ধান কূপ খনন—বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ |
| উদ্বোধনের কয়েক দিন পরে | প্রকল্প থেকে প্রত্যাহার ও কূপ সীল |
স্থানীয় প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যদি শালবাহান এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেলের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে তা স্থানীয় কর্মসংস্থান, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও এলাকার অর্থনীতির জন্য গুরুত্ব বহন করতো। আবার যদি সত্যিই উল্লেখযোগ্য স্তরের তেল না পাওয়া যায়, তবুও সঠিক তথ্য-প্রকাশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহাসিক ব্যয় ও সিদ্ধান্তের ন্যায়ত্মক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
স্থানীয় আন্দোলনকারীরা এখন দাবি করছেন—উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে পুনরায় জরিপ চালানো হোক, তাতে স্থুলভাবে দুইটি ফল পাওয়া যেতে পারে: বা তো নিশ্চিতভাবে তেলের অস্তিত্ব নেই, বা আংশিক/পূর্ণ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা কিংবা নতুন প্রযুক্তি-নির্ভর ফলাফল জনগণের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষপর্যায়ে এই ইস্যুতে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্রের উপস্থিতি ছাড়া জনমনে প্রশ্ন কেটে যাবে না। সমঅবস্থানে থাকা সংবাদকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এখন দায়িত্ব বহুগুণ বেড়েছে—এখানে প্রয়োজন নিরপেক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা, যাতে জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয় এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ উদ্যোগে সময় ও তহবিলের ব্যয় সঠিকভাবে নির্ধারিত হতে পারে।