নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার আলগির খালের ওপর নির্মিত পরিচিত "রিকশাওয়ালার বাঁধ" সোমবার দুপুরে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কেটে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রশাসন বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রবল বন্যার পরে দীর্ঘদিন অসংলগ্ন পানি জমাট বাঁধা ও পানি নিষ্কাশন সংকটের কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
কেন এ বাঁধ অপসারণ করা হলো?
প্রাথমিকভাবে জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, মাটির আড়িবাঁধটি একসময় স্থানীয় কৃষি জমি লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তা নোয়াখালী সদর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জের পানি নিষ্কাশনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি বামনী নদীতে ক্লোজার ও ১৯-পয়েন্ট রেগুলেটর নির্মাণকাজ শুরু হলে ওই বাঁধটি সরিয়ে খালের পূর্ণ প্রবাহ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কারা উপস্থিত ছিলেন, আইনশৃঙ্খলা কেমন ছিল?
বাঁধ অপসারণকালে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান, নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেফাত জামিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। নিরাপত্তা বজায় রাখতে উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও মহিলা পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা ও প্রশাসনের দাবি
প্রশাসন জানিয়েছে, বাঁধ অপসারণ ও আলগির খাল ও জালিয়ার খালের মোট ১০.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ সম্পন্ন হলে প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় ৯ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে। পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়বে এবং এলাকার প্রায় ২৮০ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ সুরক্ষার পথ সুগম হবে।
এখানে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই কাটা কাজ কি মাত্র পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পানির গতিপথ ও শাসন-প্রশাসন বদলে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হবে? স্থানীয়রা আশাবাদী হলেও শুষ্ক মৌসুমে জলবিধির কাজের বাস্তব প্রভাব পরিমাপটা কিভাবে করা হবে তা সময়ই বলবে।
- অপসারণকৃত অংশ: আলগির খালের ওপর নির্মিত মাটির আড়িবাঁধ
- খনন লক্ষ্যমাত্রা: আলগির খাল ও জালিয়ার খালের মোট 10.5 কিলোমিটার
- প্রতিবন্ধিত জনগোষ্ঠী: প্রায় 9 লাখ মানুষ
স্থানীয় এক যাচাই অনুযায়ী, বহু এলাকায় বন্যার সময় নিন্মাঞ্চলের পানি বাইরে যেতে পারত না; ফলে ফসল নষ্ট ও বসতভিটে পানিতে তলিয়ে যেত। প্রশাসনের এই উদ্যোগ তা দ্রুত বদলাতে পারে কিনা—সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু এখন।
| বিবরণ | সংখ্যা / ইউনিট |
|---|---|
| খনন করা খালের দৈর্ঘ্য | 10.5 কিলোমিটার |
| প্রভাবিত এলাকা | 150 বর্গকিলোমিটার |
| লাভবান মানুষের সংখ্যা | 9 লাখ |
| সুরক্ষিত স্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য | 280 কোটি টাকা |
চ্যালেঞ্জ ও নজরদারি
খালের পুনঃখনন ও বাঁধ অপসারণ করলেই কি সমস্যা সমাধান শেষ—তা নয়। রক্ষণাবেক্ষণ, সময়মত নালা-নালা পরিস্কার করা, রেগুলেটরের কার্যকর পরিচালনা ও স্থানীয় জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন কর্তৃক একটি সুসংহত পরিকল্পনা না থাকলে খানিকটা সহজ হয়েও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি বদলায় না।
এখানে ভাববার প্রশ্ন হলো—পানি ব্যবস্থাপনায় অংশীদারিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? স্থানীয় মৎস্যজীবী, কৃষক ও বাসিন্দাদের সাথে নিয়মিত পরামর্শ আছে কি? বামনী নদীর ক্লোজার ও রেগুলেটরের কাজ শেষ হওয়ার পর জলবহুল মৌসুমে অপসারণের প্রভাব পরিমাপের সুস্পষ্ট সূচক থাকবে কি?
আলগির খাল থেকে পানি সরে গেলে আশপাশের নিম্নভূমি কেমনভাবে সম্পর্কিত জঙ্গল-প্রণালী, মৎস্যচাষ ও স্থায়ী বসতির ওপর প্রভাব ফেলবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তুলনামূলকভাবে নিরীক্ষণ করা প্রয়োজন।
এই ঘটনার কড়া বাস্তবতা হলো—স্থানীয় প্রশাসন ও পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যে উদ্যোগগুলো জাতীয় বা আঞ্চলিক মাপের ছিল না, সেগুলো এখনো বাস্তবায়ন না করলে প্রতিটি বর্ষায় একই কষ্ট আবার ফিরে আসতে পারে। কাজটি যে ইতিবাচক পদক্ষেপ, তা স্বীকার করলেও গুরুত্বের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি তদারকি নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সাফল্য।
নোয়াখালীর কবিরহাটের মাঠ পর্যায়ের প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে—এখানে প্রশ্নও কম নেই, প্রত্যাশাও কম নয়।