নোয়াখালী সদর উপজেলার ২০১৬ সালের আলোচিত তিনজনকে গুলি করে হত্যা মামলায় আজ বিশেষ জজ আদালত কার্যত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে। বিচারক মো. শওকত আলী রোববার দুপুরে শুনানি শেষে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত যাবজ্জীবনপ্রাপ্তদের প্রত্যেককেই এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেছেন; জরিমানা পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত এক বছরের সাজা কার্যকর হবে।
ঘটনার সারমর্ম ও নির্দেশক তথ্য
মামলাটির এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২১ মে দুপুরে নোয়াখালী সরকারি কলেজ সংলগ্ন একটি হোস্টেলের পুকুরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বাকবিতাণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। সন্ধ্যার পর একটি সালিশ বৈঠক হওয়ার পর ওইদিন রাত সাতটার দিকে অভিযুক্ত দলটি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভুক্তভোগীদের ওপর হামলা চালায়।
ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে স্থানীয়রা উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিলে ডাক্তার রাজিবকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া অন্য দুইজন—ওয়াসিম ও ইয়াছিন—ও হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করেন। নিহত রাজিবের স্ত্রী মামলা করেন এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর আজ দণ্ড ঘোষণা হলো।
আদালতের রায় ও দণ্ডপ্রাপ্তদের পরিচয়
আদালতে দণ্ডপ্রাপ্তদের পরিচয় ও সাজা প্রসঙ্গে পরিশিষ্ট করা টেবিলে তথ্যগুলো তুলে ধরা হল।
| নাম | ঠিকানা (উপজেলা/পৌর) | সাজা |
|---|---|---|
| ওমর নাসির সাজু | বেগমগঞ্জ | মৃত্যুদণ্ড |
| ওমর শরীফ সুলতান | বেগমগঞ্জ | মৃত্যুদণ্ড |
| মো. সৌরভ | নোয়াখালী পৌরসভা | মৃত্যুদণ্ড |
| ফিরোজ মাহমুদ বাপ্পী | বেগমগঞ্জ | জাবজ্জীবন + ১ লাখ টাকা জরিমানা |
| কুদরত উল্যাহ | বেগমগঞ্জ | জাবজ্জীবন + ১ লাখ টাকা জরিমানা |
| হারুনুর রশীদ বাবুল | বেগমগঞ্জ | জাবজ্জীবন + ১ লাখ টাকা জরিমানা |
প্রসঙ্গ ও অবশিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মামলার পিপি ও বাদীপক্ষের আইনজীবী। আদালত জানান, রায় ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন একমাত্র গ্রেপ্তার করা আসামি ফিরোজ আলম বাপ্পী; অন্য পাঁচ আসামি পলাতক রয়েছেন। ফলে রায়ের কার্যকরের আগে আপিল বা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জের সুযোগ থাকবে।
“রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করছি,”
এই মন্তব্যটি করেছেন ১ নম্বর অতিরিক্ত আদালতের পিপি ও বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. বরুত উল্যাহ রাসেদ।
- মামলার প্রথম তদন্ত ও বিভিন্ন পর্যায়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
- বিচারে অন্য পাঁচ আসামি এখনও পলাতক—তাদের ধাওয়া করা হবে বলে আদালত সূত্র বলছে।
- জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত এক বছরের কড়া শাস্তি কার্যকর হবে।
স্থানীয় প্রভাব ও প্রশ্ন
এই ঘটনার বিচার-ফলাফল নোয়াখালী জেলায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচ্য ছিল। কি কারণে একটি সাধারণ বদলি-বিবাদ থেকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হলো, সেই প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক। মন্তব্যে উপস্থিত আইনজীবী রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করলেও ক্ষতিপূরণ বা সামাজিক পুনর্বাসন নিয়ে পরিবার ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে, সেটিও অনুসরণীয় বিষয়।
আরও একটি বিবেচ্য দিক—পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে কীভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তাঁদের অস্তিত্বে ফেরানোর প্রক্রিয়া কী, এবং রায় বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পুলিশ কী পদক্ষেপ নেবে—এসব প্রশ্ন জেলা সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
কীভাবে এগোবে মামলাটির পরবর্তী ধাপ
আইনিভাবে রায়কে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা যদি উচ্চ আদালতে আপিল করেন, তাহলে সেই আপিলের আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা স্থগিত হতে পারে। আর পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আদালত সূত্র জানায়, মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সাজা কার্যকর করতে অবশ্যই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নোয়াখালী প্রতিনিধি
দিদারুল আলম