নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটির পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামটি স্থানীয়ভাবে এখন ‘পাখির গ্রাম’ নামে পরিচিত। গ্রামবাসীর বর্ণনা ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার পাখি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বসবাস করে আসছে।
বাঁশঝাড়ে পাখিদের আস্তানা
স্থানীয়দের ভাষ্যে, গ্রামের মাঝখানে বিস্তৃত বড় একটি বাঁশঝাড়ে প্রতিটি ডালে—সাদা বক, পানকৌড়ি, রাতচরা, ঘুঘু, শালিকসহ নানা প্রজাতির পাখি প্রতিদিন উত্তাল করা লহর সৃষ্টি করে। গ্রামটিতে মোট জায়গাটি রয়েছে প্রায় ৪ একর ২০ শতাংশ এলাকাজুড়ে। পূর্বপুরুষদের যুগ থেকেই এখানে পাখির অনবরত উপস্থিতি রয়েছে; তাই কালের বয়ে যাওয়া নামের জায়গায় ভবমান এখন সবাই এই স্থানকে ‘পাখির গ্রাম’ বলে অভিহিত করেন।
দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ও স্থানীয় কণ্ঠ
পাখিদের উপস্থিতি শুধু দৃশ্যত নয়—এটি গ্রামবাসীর দৈনন্দিন রুটিনেও প্রতিফলিত। ভোরবেলা পাখিদের কিচিরমিচিরে সবার ঘুম ভাঙে। সন্ধ্যায় হাজার হাজার পাখির ডাক-কল কলে এলাকা জীবন্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম বলেন,
"আমার দাদার আমল থেকেই আমরা এই পাখিগুলোকে দেখে আসছি। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি কেউ যেন পাখিদের ক্ষতি না করে।"
আরেক স্থানীয় মোশাররফ হোসেন জানান, দর্শনার্থীদের আগমন বাড়লেও এখানে বসার স্থান না থাকায় তারা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন না। একজন দর্শক আবু হোসেনও বলেন, এলাকা গেলে পাখির ডাক শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় ভ্রমণসুবিধা সীমিত।
সংরক্ষণগত উদ্বেগ
স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন যে সম্প্রতি কিছু অসাধু শিকারি ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের অভাবের কারণে পাখিদের সংখ্যা কমছে—এটি উদ্বেগের কথা। গ্রামবাসীরা সরকারিভাবে এই এলাকা অভয়াশ্রম ঘোষণা করে সীমানা প্রাচীর এবং নজরদারির ব্যবস্থা করার দাবি তুলেছেন।
প্রশাসনের বরাত ও করণীয় পরিকল্পনা
ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শায়লা সাঈদ তন্বী বলেন, চিলাহাটির পাখির অভয়াশ্রমটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রশাসন ইতোমধ্যে সেখানে কিছু সংস্কার কাজ করেছে এবং একটি পুকুর খনন করা হয়েছে। তিনি জানান, বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে এই স্থানটিকে কিভাবে পর্যটনবান্ধব ও নিরাপদ করা যায়—এ নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
- বর্তমান অবস্থা: প্রায় ৪ একর ২০ শতাংশ বাঁশঝাড়, স্থানীয় পর্যটকরা আসেন, বসার সুবিধা নেই।
- উদ্বেগ: শিকারি ও পর্যাপ্ত সংরক্ষণের অভাব—পাখির সংখ্যা কমার আশঙ্কা।
- প্রশাসনের উদ্যোগ: পুকুর খনন, বন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা প্রণয়ন।
সংরক্ষণ ও পর্যটন — সমন্বয়ের প্রয়োজন
স্থানীয়দের আবেদন ও প্রশাসনের উদ্বেগ দুই পক্ষেই মিল আছে—এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা এবং তা-কে পর্যটনের জন্য উপযোগী করা। তবে এ কাজটি করতে গেলে কয়েকটি মৌলিক ব্যবস্থা জরুরি হবে: যথাযথ সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি, শিকার রোধকরণ, নিরাপদ বসার ও পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি এবং স্থানীয়দের অন্তর্ভুক্তি।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আবদ্ধ এলাকা | প্রায় ৪ একর ২০ শতাংশ |
| অনুমানিত বয়স | প্রায় ২০০ বছর |
স্থানীয়রা আশা রাখছেন প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। পাখিদের এই ঐতিহ্যবাহী আশ্রয় থাকা মানেই কেবল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যও নয়—এটি এলাকার সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত মর্যাদা। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে ‘পাখির গ্রাম’ কেবল সংরক্ষিত জায়গা হিসেবে থাকবে না, স্থানীয় পর্যটন ও জীববৈচিত্র্য শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
রিপোর্ট: শাহজাহান ইসলাম লেলিন/এএমকে, নীলফামারী