“রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”
নীলফামারীতে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। রবিবার (১৬ আগস্ট) বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে কর্মসূচির অফিসিয়াল শুরু করা হয়। পরে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয় এবং অবশেষে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আলোচনা সভায় সভা সংলাপ শেষে সমাপ্ত করে আয়োজকরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আল ফারুক আব্দুল লতিফ। আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাক, কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ শাহিনা বেগম ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল হক। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব ও সমন্বয় করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বরুণ কুমার মন্ডল, এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মহসিন রেজা রুপম ও টুপামারী ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রিফাত আরা সিমি।
জেলার মাছদান ও ঘাটতির চিত্র
আলোচনা সভায় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বরুণ কুমার মন্ডল জানান, নীলফামারীর বার্ষিক মাছের চাহিদা এবং উৎপাদনের মধ্যে 눈ে পড়ার মত ব্যবধান রয়েছে। তিনি জেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান পরিসংখ্যান তুলে ধরেন এবং ঘাটতি পূরণে নেওয়া হচ্ছে যে উদ্যোগগুলো তারও খোঁজ দেন।
| বিবরণ | পরিমাণ (মেট্রিক টন) |
|---|---|
| বার্ষিক চাহিদা | ৪১,৪২৭ |
| উৎপাদন | ৩৪,৩৬৭ |
| ঘাটতি | ৭,০৬০ |
এই চিত্র থেকে স্পষ্ট যে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ালে জেলার বাজারে মাছের ঘাটতি কমে আনা সম্ভব। বক্তারা বলেন, ঘাটতি পুষিয়ে নিতে লবণাক্ততা সহনশীল কিছু প্রণালী অন্বেষণ ও স্থানীয় জলাশয় ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া প্রয়োজন।
উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া হচ্ছে যেসব উদ্যোগ
আলোচনায় ঘোষণা করা হয়েছে কিছু বাস্তব কর্মসূচি, যার মধ্যে আছে—
- খাল-বিল, পুকুর ও নদীতে মাছচাষ বাড়ানো।
- মানসম্পন্ন নার্সারি স্থাপন।
- জেলেদের ও মৎস্যচাষীদের প্রশিক্ষণ প্রদান।
- মৎস্য গ্রাম নির্মাণ ও স্থানীয়ভাবে মাছচাষে জনগণকে উৎসাহিত করা।
এই উদ্যোগগুলো কার্যকর হলে মাত্র পরিমিত অর্থায়ন ও পরপর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে বলে মৎস্য কর্মকর্তারা মনে করেন।
সফল মৎস্যচাষীদের অংশগ্রহণ ও সম্মাননা
আলোচনা সভায় জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সফল মৎস্যচাষীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। কিশোরগঞ্জ উপজেলার চাঁদখানা ইউনিয়নের সাইফুজ্জামান, সদর উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের জাবেদ আলী এবং খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের আব্দুল মালেক তাদের চাষাবাদের কৌশল ও বাজারজাতকরণ নিয়ে কথা বলেন। বক্তারা স্থানীয় পর্যায়ে পোনা, খাদ্য ও সেচ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানের শেষে কয়েকজন সফল চাষী এবং মৎস্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা জেলে সংগঠনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। গুণগত মানসম্পন্ন পোনা উৎপাদনের জন্য সদর উপজেলার উত্তর চওড়া গ্রামের বুদারু রায়কে সম্মাননা দেওয়া হয়। গুণগত কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনের জন্য কিশোরগঞ্জের সাইফুজ্জামানকে এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় কাজে যুক্ত সৈয়দপুর শহরের কুন্দল এলাকার জেলে সংগঠনকেও পুরস্কৃত করা হয়।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত মৎস্যচাষি, জেলে ও জনপ্রতিনিধিরা এই কর্মসূচিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তারা বলেন, প্রশিক্ষণ ও নার্সারি প্রতিষ্ঠা হলে পোনা সরবরাহের মান উন্নত হবে এবং স্থানীয় চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। তবে একাধিক বক্তাই টেকসই পানি ও সঠিক প্রযুক্তি যোগান না দিলে সীমিত লাভ হবে বলে সতর্ক করেছেন।
জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিতে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও জনপ্রতিনিধি, মৎস্যচাষি ও জেলেরা অংশ নেন। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এ ধরনের প্রয়াস অব্যাহত রাখলে স্থানীয়ভাবে মাছ উৎপাদন ও আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে অগ্রগতি সম্ভব বলে উপস্থিতরা আশা প্রকাশ করেছেন।