নীলফামারীর সদর উপজেলার কুন্দপুকুর ইউনিয়নের লালপাড়া এলাকায় বুধবার (২৬ আগস্ট) মধ্যরাতে নাছরিন নাহার (৩৫) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবার অভিযোগ করে, তাকে দীর্ঘদিন যৌতুক দাবির জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত একাধিকবার সালিশও হয়েছে।
পুলিশ ও পরিবারের বরাতে ঘটনার বিবরণ
পুলিশ জানায়, রাতেই মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয় এবং ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নাছরিন ছিলেন নীলফামারী শহরের কলেজপাড়া এলাকার আব্দুল জব্বারের মেয়ে এবং লালপাড়া এলাকার আব্দুল মান্নানের স্ত্রী। মামলার এজাহার অনুযায়ী, চার বছর আগে নাছরিনকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন মান্নান।
নাছরিনের বাবা আব্দুল জব্বার অভিযোগ করেন, বিয়ের সময় তাদের পরিবারের দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের পরও কিছুদিন ধরে আরও তিন লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছিল। দাবি না মানলে মেয়েকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হত এবং গোষ্ঠীভিত্তিক ভাবে সালিশও হয়েছে। ঘটনার দিন ফের তিন লাখ টাকা দাবি করা হলে নাছরিন প্রতিবাদ করলে পরিবারের বয়ান অনুযায়ী তাকে মারধর করে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ ঝুলিয়ে রেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে পরিবার বলছে।
“এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
কে-কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মামলা
নাছরিনের বাবা আজ (মামলা দাখিলের সময়) থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগ সূত্রে অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে চারজনের — স্বামী আব্দুল মান্নান, তার বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন, প্রথম স্ত্রীর ছেলে আলমগীর হোসেন ও আলমগীরের স্ত্রী আরিফা বেগম। নীলফামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
| আবেদনকারী/পক্ষ | নাম | অভিযুক্তের সংযোগ |
|---|---|---|
| নিহত ব্যক্তি | নাছরিন নাহার (৩৫) | আบ্দুল মান্নানের স্ত্রী |
| অভিযোগকারী | আব্দুল জব্বার | নাছরিনের বাবা |
| অভিযুক্ত | আব্দুল মান্নান | স্বামী |
| অভিযুক্ত | দেলোয়ার হোসেন | মান্নানের বড় ভাই |
| অভিযুক্ত | আলমগীর হোসেন | প্রথম স্ত্রীর ছেলে |
| অভিযুক্ত | আরিফা বেগম | আলমগীরের স্ত্রী |
স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি লালপাড়া গ্রামে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিহতের পরিবার বলছে, সহপাঠে ও প্রতিবেশীদের কাছে নাছরিন এক শান্ত চরিত্রের মানুষ ছিলেন এবং ধারাবাহিকভাবে ওপর চাপ বাড়ার ফলে পরিবার বাধ্য হয় মুল্য প্রদান করে সমস্যা সামাল দিতে। পুলিশের কাজের স্বচ্ছতা এবং দ্রুত তদন্ত দাবি করে মনোস্তাত্ত্বিক ও আইনি প্রতিকার চান তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, সালিশে প্রতিকার না পেলে বিচারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রায়ই ন্যায্য প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে যৌতুক-নির্ভর সহিংসতায় মহিলারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। নীলফামারীর বিভিন্ন দফায় এ ধরনের ঘটনা বাজারে এসেছে বলে স্থানীয় সোশ্যাল ওয়ার্কারদের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তের পদ্ধতি
ওসি জিল্লুর রহমান জানান, ঘটনার অবস্থা ও পরিবারের অভিযোগ বিবেচনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ফলাফল এবং ঘটনাস্থল তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে থানায় মামলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনানুগ ধারা প্রয়োগ করে দৃঢ়ভাবে তদন্ত চালানো হবে।
- মৌলিক দাবি: পরিশোধিত যৌতুকের পরও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছিল।
- পরিবারের দাবি: হত্যা ঘটেছে; আত্মহত্যা নয়—পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ।
- পুলিশি দায়িত্ব: ময়নাতদন্ত, দলবল তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য সংরক্ষণ করা।
নিহতের পরিবারের অনুরোধ, স্থানীয় প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো দ্রুত ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করুক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক যাতে ভবিষ্যতে এমন দমন ও নির্যাতন থেকে নারীরা সুরক্ষিত থাকতে পারে। পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি কর্মকাণ্ড প্রকাশ করা হবে বলে থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।