মাদারীপুরের নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জেলা আগামী পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ে এই অতি-সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল অবাধে পেতে রাখা হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, এতে শুধু বড় মাছ নয়, পাশাপাশি রেণু-পোনা, ডিমওয়ালা মা-মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও নির্বিচারে আটকা পড়ে যাচ্ছে এবং ফলে দেশেরী মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।
কোথায় বেশি সমস্যা?
সূত্রগুলো বলছে, মাদারীপুর সবার্ড (সদর), শিবচর, কালকিনি, ডাসার ও রাজৈরের নদী, খাল ও বিলগুলোতে এ জালের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সরেজমিন পরিদর্শনে শিবচর উপজেলার অগভীর অংশগুলো—অর্ধেক পানিতে ডুবিয়ে, বাকি অংশ ডাঙায় রেখে যে ভাবে জাল পেতে রাখা হয়েছে, তা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে একই জাল দিনরাত একই স্থানে রেখে দেওয়া হয়।
জলোচ্ছ্বাস নয়—প্রজনন বন্ধ
চায়না দুয়ারি জালের সূক্ষ্ম ফাঁস ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমধারণকারী মাদার ফিশ ধরতেও সক্ষম। মৎস্য সংশ্লিষ্টরা এবং স্থানীয়রা মনে করছেন, একটি জালে একসঙ্গে বিভিন্ন আকারের মাছ ও রেণু-পোনা আটকা পড়ায় প্রজননক্ষম অর্থাৎ ভবিষ্যৎ গঠনকারী মাছই নিক্ষুণţভাবে কমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এখানকার দেশীয় মাছের উৎপাদন দারুণভাবে হ্রাস পেতে পারে, যা স্থানীয় জীবনযাত্রা ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও দাবি
স্থানীয়রা বলছেন, কয়েক বছর আগেও জেলায় দেশীয় মাছ প্রচুর ছিল এবং হাট-বাজারে তা সরবরাহ হত। কিন্তু নিয়মিতভাবে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের কারণে আজ সেই উপস্থিতি অনেকটাই কমে এসেছে। তারা অভিযোগ করেন প্রশাসনের তদারকি অনিয়মিত—মধ্যবর্তী অভিযান হলেও নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অসাধু জেলেরা আবার রাতের আঁধারে জাল পেতে শুরু করে।
- নির্বিচারে মাছ নিধনের ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।
- রেণু-পোনা, ডিমওয়ালা মা-মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও শামুকসহ নানা জলজ জীবপ্রাণী বিনষ্ট হচ্ছে।
- নিয়মিত অভিযান না থাকায় জাল বিক্রি ও ব্যবহারের উৎস নিয়ন্ত্রণ হচ্ছেনা বলে অভিযোগ রয়েছে।
কী ব্যবস্থা দাবি করা হচ্ছে?
স্থানীয়রা এবং মৎস্য সংশ্লিষ্টরা একই সঙ্গে দাবি করছেন—চায়না দুয়ারি ব্যবহারের বিরুদ্ধে কেবল মৌসুমি অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং বছরজুড়ে নিয়মিত নজরদারি, জাল বিক্রির স্থানগুলোতে তৎপরতা, অবৈধ জাল জব্দ ও দণ্ডবিধির কার্যকর প্রয়োগ দরকার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও তা পুরোপুরি সমস্যার স্থায়ী সমাধান করছে না বলে তারা মনে করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও সমস্যা সংক্ষিপ্ত তালিকা
| উপজেলা | প্রধান সমস্যা |
|---|---|
| সদর | খাল-বিলে চায়না দুয়ারি ব্যবহার, পোনা ধ্বংস |
| শিবচর | অগভীর অংশে জাল রেখে প্রজনন হ্রাস |
| কালকিনি | খাল-বিলে অবৈধ নিধন |
| ডাসার | রাতের আঁধারে পুনরায় জাল বসানো |
| রাজৈর | বাজারে দেশীয় মাছ সরবরাহ কমেছে |
অবশ্যই কী করা উচিত?
জেলা পর্যায়ের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়াও নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি:
- বিক্রেতা ও উৎপাদনস্থলে নিয়মিত তল্লাশি ও অবৈধ জাল জব্দ।
- অবৈধ ড্রেজিং বা অন্য প্রকার নদী-পরিবর্তনমূলক কার্যক্রম বন্ধ করে নদীর প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা।
- মৎস্য সম্প্রদায় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রজনন মৌসুমে স্ট্রিক্ট জোন ভঙ্গ না করার তদারকি।
এ পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ থেকে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে কোন বিস্তারিত পদক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, যদি দ্রুত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে মাদারীপুরের দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদে অনিবার্য ক্ষতির শিকার হবে।