মাদারীপুর থেকে ১০ মাস ধরে নিখোঁজ মো. সাগর মিয়া (২০) — পরিবার ও স্থানীয়রা দাবি করছেন তিনি মানবপাচারকারীদের হাত ধরে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকে কোনো খোঁজ নেই। শনিবার (২২ আগস্ট) শহরে নিজ বাড়িতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ যুবকের মা বেলাতুননেছা মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করেছেন।
পরিবারের অভিযোগ ও আর্থিক ক্ষতি
পরিবারি সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোঁয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার কৃষক খবির মোল্লার ছেলে সাগর মিয়া উন্নত জীবনের আশায় অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার মত প্রলোভনে পড়ে। স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর কাছ থেকে ইটালি যাওয়ার চুক্তি করে তিনি। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩ নভেম্বর সাগরকে প্রথমে সৌদি আরব নেওয়া হয় এবং পরে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।
পরিবারের দাবি, দালালরা লিবিয়ায় পৌঁছে তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে আরও অর্থ আদায় করে। সব মিলিয়ে তারা মোট ৩২ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে সাগরের কোনো হদিশ মেলেনি। অর্থের পরিমাণ এবং লেনদেনের বিস্তারিত নিম্নরূপ:
| বিবরণ | টাকার পরিমাণ |
|---|---|
| প্রাথমিক চুক্তি (ইতালি যাওয়ার জন্য) | ২৩ লাখ টাকা |
| লিবিয়ায় আরও দাবীকৃত অর্থ | ৯ লাখ টাকা |
| মোট পরিশোধ | ৩২ লাখ টাকা |
মাতার দাবি ও মামলা
সংবাদ সম্মেলনে সাগরের মা বেলাতুননেছা কাঁদতে কাঁদতে দাবি করেন যে দালালদের প্রতিশ্রুতির জালে পড়ে তিনি ও পরিবার তাদের বসতভিটে বন্ধক রেখে এই টাকা দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন যে দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করলে উল্টোভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
“ছেলেরে ফিরাইয়া দেওয়ার কথা কইয়া দালালে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিছে। এখন জমিজমা সব শেষ, আমরা ভিটেমাটি ছাড়া। আমি আমার সোনার টুকরা বাবার সন্ধান চাই।”
এই পরিস্থিতিতে বেলাতুননেছা মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলার প্রধান অভিযুক্ত গোলাম মওলা ও তার সহযোগীরা বর্তমানে পলাতক বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং মানবপাচার রোধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কোনো ব্যক্তির সরাসরি বক্তব্য রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্ত ও সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দিকগুলো এখন সরকারি তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
স্থানীয় প্রভাব ও ব্যবহারিক দিক
এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে কয়েকটি দিক স্পষ্ট করে তুলেছে — প্রথমত, অভিবাসনের অবৈধ পথের কারণে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে; দ্বিতীয়ত, দালালচক্র স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভর করে দীর্ঘ সময় অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে; এবং তৃতীয়ত, নিখোঁজ ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর, তা প্রশ্নের মুখে।
- পরিবার: ভিটেমাটি বন্ধক রেখে মোট ৩২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
- আইনি পদক্ষেপ: মানবপাচার দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা।
- পুলিশ: তদন্ত অব্যাহত ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
স্থানীয় সমাজতন্ত্র ও স্বজনরা বলছেন, যারা অভিবাসনের জন্য বিদেশের পথ বেছে নেন তাদের জন্য তথ্যভিত্তিক পরামর্শ এবং সরকারি নির্দেশনা অপরিহার্য। পাশাপাশি, দালালচক্র শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে।
এই ঘটনার নথিভুক্ত তথ্য ও মামলার তদন্ত থেকে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা নিখোঁজ সাগর মিয়াসহ তার পরিবারের প্রতিকার ও পুনর্মিলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আপাতত পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—দু'পক্ষই নীরবপ্রত্যাশায় রয়েছেন।