খাগড়াছড়ি জেলার ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে তিনটি বিদ্যালয়ে কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। জেলা শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, ওই তিন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট ৪২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।
শতভাগ ফেল হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো
- ভাইবোনছড়া গার্লস হাই স্কুল
- জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাই স্কুল
- তারাবনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়
জেলা শিক্ষা অফিসের সার্বিক তথ্য অনুযায়ী, স্কুল পর্যায়ে এইবার জেলা থেকে মোট ৭৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে পাস করেছে ২৭৬৬ জন। ফলে জেলার গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৩৫.৫৬ শতাংশ। একই ফলনায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯০ জন পরীক্ষার্থী।
উপজেলায় পার্থক্য—কোনো কোনো এলাকায় ফল ভালো, কোথাও নিচু
জেলা শিক্ষা অফিসের উপাত্তে উপজেলা ভিত্তিক পার্থক্য স্পষ্ট। স্কুল পর্যায়ে বিভিন্ন উপজেলায় পাসের হার নিম্নরূপ:
| উপজেলা | পাসের হার (%) |
|---|---|
| খাগড়াছড়ি সদর | ৫০.৭৫ |
| দীঘিনালা | ২২.৮৭ |
| পানছড়ি | ৩১.৫২ |
| মহালছড়ি | ২৯.৬৩ |
| মাটিরাঙ্গা | ৩২.১৮ |
| গুইমারা | ৩১.১২ |
| মানিকছড়ি | ৪০.২১ |
| রামগড় | ৩৪.৬৬ |
| লক্ষ্মীছড়ি | ৩৪.৮১ |
উপজেলা ভিত্তিক এই এন্টির মধ্যে দীঘিনালার পারফরম্যান্স সবচেয়ে নিম্ন—শতকরা হিসেবে মাত্র ২২.৮৭%। স্থানীয়রা বলছেন, প্রত্যন্ত ও পাহাড়ি অঞ্চলের অনুকূলে না থাকা পরিবহন, মৌসুমি জলবায়ু ও অর্থনৈতিক চাহিদার কারণে শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বজায় রাখতে পারছে না।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও শিক্ষকরা কী বলছেন
শিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত এক শিক্ষক আবু সমা বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে পরিবারকে সাহায্য করতে হয়; বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ আরও কঠিন হওয়ায় নিয়মিত উপস্থিতি ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, এই ধরনের বাধা থাকায় শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে এবং ফলাফল নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়।
"প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতিতেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়,"— আবু সমা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক দীঘিনালা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়কে উদাহরণ টেনে বলেন, এই স্কুল দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটে ভুগছে; বর্তমানে মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমনই তাদের মতামত।
স্থানীয়রা চান তদন্ত ও তদারকি
স্থানীয়রা বলছেন, কেবল দুর্গম যোগাযোগ বা আর্থিক পরিস্থিতিকে দায় দিয়ে পাশ-ফেল ব্যাখ্যা করে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা যাবে না। তারা দাবি করছেন—শতভাগ ফেল হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের ফলাফল নিয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্ত করা হোক। বিশেষ করে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যাচাই করা উচিত:
- নিয়মিত পাঠদান হয়েছিল কি না এবং শিক্ষক উপস্থিতির হার কত ছিল
- বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট আছে কি না
- শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও প্রবেশ পরীক্ষায় প্রস্তুতি কেমন ছিল
- শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি এবং পরিদর্শন কার্যক্রম কতটা কার্যকর ছিল
স্থানীয়রা আরও বলেছেন—শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিস্থিতি, আর্থিক সহায়তা ও স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত সমরথন না থাকলে অগ্রগতির পথে বাধা রয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে শ্রেণিকক্ষ-ভিত্তিক পরিকল্পনা, শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়াতে হবে বলে তারা মনে করেন।
জেলা শিক্ষা অফিসের প্রকাশিত এই ফলাফল স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের জন্য সতর্ক সংকেত। শিক্ষা বিভাগের তৎপরতা, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়াশোনাকে সহায়তা করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী বছরে অনুরূপ পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে।
রিপোর্টে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে শিক্ষার মান পুনরুদ্ধার সম্ভব—এটাই শিক্ষাব্যবস্থা সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।