চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে খাগড়াছড়ি জেলায় এবারের এসএসসি ও সমমান (দাখিল) পরীক্ষার ফলাফলে গঠনমূলক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্যে জানা যায়, জেলার তিনটি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী সবাই ব্যর্থ হয়েছেন—একটি জরুরি সমস্যা হিসেবে আগামি শিক্ষাবর্ষে মেরামত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
পাশের হার ও আঞ্চলিক তুলনা
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে দেখা যায়, এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় খাগড়াছড়ি জেলায় সম্মিলিত পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৩৭.০৪ শতাংশ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সামগ্রিক বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৯.৪৮ শতাংশ, যেখানে খাগড়াছড়ির ফল তা থেকে অনেক কম। জেলা স্কুলগুলো থেকে এসএসসিতে মোট ৭ হাজার ৭৭৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল; তন্মধ্যে পাস করেছেন ২ হাজার ৭৬৬ জন।
| পরীক্ষার ধরণ | পরীক্ষার্থী (অংশগ্রহণ) | পাস | পাসের হার |
|---|---|---|---|
| এসএসসি (সকল স্কুল) | ৭,৭৭৮ | ২,৭৬৬ | ৩৫.৫৫% |
| দাখিল (মাদরাসা) | ৭৬৮ | ৪০০ | ৫২.০৮% |
কোথায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থা?
জেলা পর্যায়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তিনটি স্কুলের নাম—ভাইবোনছড়া গার্লস হাই স্কুল (সদর), জারুলছড়ি হেডম্যানপাড়া হাই স্কুল (দীঘিনালা) এবং তারাবানিয়া হাই স্কুল (দীঘিনালা)। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৪১ জন—তারা সবাই ফেল করেছেন। নতজানু এই ফলাফল স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শিক্ষা কর্মকর্তার মন্তব্য
"যে তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেগুলো তুলনামূলক দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা থেকে দূরে সরে গেছে। পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়া ছাড়া ভালো ফলাফলের অন্য কোনো উপায় নেই।"
জেলা শিক্ষা অফিসার সুভাষ চন্দ্র সিকদারের এ মন্তব্যে স্থানীয় সংকটের দুইটি মুখ—অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শিক্ষার্থীদের অনুশীলন ও পড়াশোনায় অনাগ্রহ—দুটোরই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
জিপিএ-৫ ও মাদ্রাসার পারফরম্যান্স
এই বছর জেলার স্কুল পর্যায়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯০ জন শিক্ষার্থী, যেখানে মাদরাসা পর্যায়ে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৬ জন। মাদরাসাগুলোর মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৭৬৮ জন এবং তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৪০০ জন, ফলে মাদরাসার পাসের হার ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি—৫২.০৮%।
- জেলা মোট অংশগ্রহণকারী (স্কুল): ৭,৭৭৮ জন
- স্কুলভিত্তিক পাস: ২,৭৬৬ জন
- জিপিএ-৫ (স্কুল): ১৯০ জন; (মাদরাসা): ৬ জন
প্রভাব ও সম্ভাব্য কারণ
জেলার এমন নিম্ন ফলাফলের পেছনে বহু কারণে কাজ করে থাকতে পারে—অবকাঠামো অভাব, শিক্ষক সংকট, দুরারোগ্য ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং পড়াশোনার পরিবেশগত সমস্যা। জেলা শিক্ষা অফিসারের বক্তব্য অনুযায়ী তিনটি ব্যর্থপ্রাপ্ত স্কুল দুর্গম এলাকায় অবস্থান করে—এটি যুক্তি দেয় যে ভৌগোলিক ও সুবিধাগত সীমাবদ্ধতা শিক্ষাবৃদ্ধিতে বড় বাধা।
স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষক গোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনলাইন বা অতিরিক্ত ক্লাসের সুবিধা না থাকা, রুটিনে অনিয়ম, এবং মাঝে মাঝে শিক্ষক বদলি ও শিক্ষাবর্ষে শিক্ষালয়ের শক্তিশালী তদারকির অভাবও পার্থক্য ঘটায়। জেলা প্রশাসন কর্তৃক সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ না হলে, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ক্ষতির মাত্রা বাড়তে পারে।
পরবর্তী করণীয় ও প্রত্যাশা
জেলা শিক্ষা কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে কেবল ফল প্রকাশের পর পরিসংখ্যান দেখানোই যথেষ্ট নয়; জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে দুর্বল স্কুলগুলোতে মনযোগ দিতে হবে—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের টিউশন, পাঠদানের মানোন্নয়ন, এবং স্থানীয়ভাবে উপযোগী শিক্ষানবান নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
পরিবর্তনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা মিলিতভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করলে পিছিয়ে থাকা বিদ্যালয়গুলোকে ধীরে ধীরে মানোন্নয়নের পথে নেওয়া সম্ভব। তবে তা হলে বাস্তবধর্মী সমীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে—নাহলে পরবর্তী বছরেও একই ধরণের ফলাফলের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।