গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ির সন্নিহিত ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজদিঘি, স্থানীয় নামেই ঢোলসমুদ্র, আজ কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা ও অব্যবস্থাপনায় দ্রুত বিপন্ন হয়ে পড়েছে। কয়েক দশক আগে এখানে পরিবারের সৌন্দর্য ও জনজীবনের তারতম্য রয়ে গেলেও এখন অধিকাংশ অংশ বন্ধ হয়ে গাছেদের ঘন আচ্ছাদনে মুড়ে আছে এবং দূর থেকে তা যেন সবুজ কোনো মাঠই মনে হয়।
ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ও নির্মাণ
লোকসভ্য সূত্র অনুযায়ী, ১৮৩৫ সালে ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজা রামেন্দ্র নারায়ণের পিতামহ, জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী, এই দিঘিটি খনন করেন। ভাওয়াল রাজপরিবারের ইতিহাস ও প্রতিপত্তির সঙ্গে জড়িত অনেক স্থাপনার মতোই এই দিঘিও স্থানীয় স্মৃতিতে বিশেষ স্থান রাখে।
বর্তমান অবস্থা: কচুরিপানা ও বর্জ্য
সাম্প্রতিক স্রেজমিন পরিস্থিতি অনুসারে দিঘিটির প্রায় পুরো অংশ ঘন কচুরিপানায় ঢাকা। কোথাও কোথাও স্বচ্ছ জল দেখা যায় না। দিঘির পশ্চিম ও উত্তর তীরের কিছু অংশে বর্জ্য, বিশেষ করে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ ও অন্যান্য আবর্জনা দুর্বহভাবে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবহেলার ফলে পানির গুণগত মানও বড় ধরনেরভাবে নষ্ট হয়েছে।
স্থানীয়দের স্মৃতি ও উদ্বেগ
শৈশবে এই দিঘিতে প্রতিদিন শত শত মানুষ গোসল ও সাঁতার কাটতেন; দিঘির শান বাঁধানো ঘাট ছিল সামাজিক মিলনস্থল ও বিনোদনের কেন্দ্র। স্থানীয়রা এই পরিবর্তনকে গভীরভাবে বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন।
"শৈশবের অনেক স্মৃতি রয়েছে ভাওয়াল রাজদিঘিকে ঘিরে। বন্ধুরা দলবেঁধে খেলাধুলা শেষে রাজদিঘীর শান বাঁধানো ঘাটে কত ঝাঁপাঝাপি, সাঁতার কেটেছি। একসময় দিঘির পানি খুবই স্বচ্ছ ছিল। অযত্ন-অবহেলার কারণে আজ ঐতিহাসিক রাজদিঘী অস্তিত্ব সংকটে" — বুরহানউদ্দিন অরণ্য, গাজীপুর মহনগরীর বাসিন্দা।
"দিঘির উত্তর পাশে কয়েকটি অংশে যত্রতত্র পলিথিন ব্যাগসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এটি রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।" — মো. কাজল মিয়া, স্থানীয় বাসিন্দা।
পরিবেশগত ও সামাজিক অবস্থা
দিঘির পানি আচ্ছাদিত কচুরিপানায় রূপ নেওয়ায় না শুধু ঐতিহাসিক সংরক্ষণহীনতা দেখা দিয়েছে, বরং স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও প্রতিকূল প্রভাব পড়তে পারে। একসময় এখানকার জলের স্বচ্ছতা ও পরিষ্কারতাই স্থানীয়দের স্বাস্থ্য ও বিনোদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজ সেই সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির আভাস আছে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও স্থানীয় প্রত্যাশা
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তৎপর হয়ে দিঘিটি পরিষ্কার, কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তদুপরি, ঐতিহাসিক দিঘির সংস্কারের মাধ্যমে জনসমক্ষে ফিরিয়ে আনা গেলে পর্যটন ও স্থানীয় জীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
- পরিষ্কার অভিযান: দিঘির কচুরিপানা উচ্ছেদ ও বর্জ্য অপসারণ।
- পানির গুণগত মান পরীক্ষা: নিয়মিত পানি মান নিরীক্ষণ ও দূষণ রোধ।
- স্মারক সংরক্ষণ: ঐতিহ্য ধারণে ঘাট পুনঃস্থাপন ও স্থানীয় ঐতিহাসিক বোর্ড অথবা কমিটি গঠন।
সংক্ষিপ্ত সময়রেখা
| বছর | ঘটনা |
|---|---|
| ১৮৩৫ | জমিদার কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী দিঘি খনন করেন |
| বিগত কয়েক দশক | দিঘি জনসাধারণের আচরণ ও অবহেলার কারণে কচুরিপানা ও বর্জ্যে আক্রান্ত |
স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হলে এবং দ্রুত উদ্যোগ নিলে ঐতিহাসিক এই জলাধারকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। তা না হলে শুধু একটি জলাশয়ই নয়—স্থানীয় স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিবেশ—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরবর্তীতে প্রশাসন কী কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং স্থানীয় কমিউনিটি কতটা সাংগঠনিকভাবে কাজ করবে, সেটাই নির্ধারণ করবে ভাওয়াল রাজদিঘির ভাগ্য।
শাহনাজ পারভীন, গাজীপুর প্রতিনিধি
WE NEWS