ঢাকা গত কয়েক বছরে বাসযোগ্যতার সূচকে তলানিতে নামে—এমনই সতর্কতা জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। মঙ্গলবার রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে কনফারেন্স হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা নগরজীবনের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বলেছে, দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ঢাকা আনুগত্যহীন নগর হিসেবে আরো নীচে পড়বে।
বৈশ্বিক সূচকে ঢাকা: শংকাজনক অবস্থান
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম, যা নগর পরিকল্পনায় ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। উপস্থিত প্ল্যানার্স এবং বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বাস্তবায়ন না হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাবই আজকের পরিস্থিতির মূল কারণ।
“বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম”—বিআইপি সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম
নগর সমস্যার তালিকা ও প্রভাব
বিআইপির ভাষ্য অনুযায়ী ঢাকার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো ছিল:
- অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অস্তিগত ভবনঘনত্ব
- পরিবেশজৈব ও বায়ু-শব্দদূষণ
- জলাবদ্ধতা এবং দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি
- সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান সংকট
- জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি—ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রভৃতি
এসব সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব নগরজীবনকে প্রভাবিত করছে—যানজট ও পরিবেশঝুঁকি বাড়ছে, নগরের নান্দনিকতা ও সড়ক নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেছেন।
সবুজ-মহল ও দৈহিক পরিসংখ্যান
বিআইপি সদস্যরা বিশেষভাবে সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের অভাবকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়েছেন। সম্মেলনে বলা হয়েছে, ৯৯.২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ঢাকার সবুজ অংশ মাত্র ৭.৯৯ শতাংশ—নগরবাসীর জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
| আইটেম | সংখ্যা |
|---|---|
| ঢাকার মোট ক্ষেত্রফল | ৯৯.২৯ বর্গকিলোমিটার |
| সবুজ এলাকাসহ অনুপাত | ৭.৯৯ শতাংশ |
বৈচিত্র্যময় প্রস্তাব ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, পূর্বে প্রণীত নীতিমালা থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি এবং অন্যান্য পরিকল্পনাবিদরা একাধিক পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়েছেন—শহরের পরিবহন, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জনসেবা একগুচ্ছভাবে দেখে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা করতে হবে।
সভায় নাটকীয়ভাবে যে সব বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে সেগুলো হলো সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ডের অপরিকল্পিত বসানো, শহরের আলোকসজ্জা ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। বক্তারা মনে করান যে এসব ইস্যু নগরের নান্দিকতা, নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
কী করণীয়—সংক্ষিপ্ত সুপারিশ
বিআইপির বক্তারা অবিলম্বে নেওয়ার মতো কিছু মূল উদ্যোগ তুলে ধরেছেন—যা বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি উন্নতি পেতে পারে:
- দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কঠোর বাস্তবায়ন
- প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত করা
- সবুজ ও উন্মুক্ত স্পেস সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ
- দক্ষ ও পরিবেশগতভাবে টেকসই বর্জ্য ও জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক ও সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান, স্থানিক পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ এ কে এম রিয়াজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এবং বোর্ড সদস্য তালহা তাসনিম। তারা সবাই মিলিতভাবে বলেছেন—ঢাকার পুনরুদ্ধার কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতিও দাবি করে।
ঢাকার বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে নগরীর জীবনমান আরও নীচে নামতে বাধ্য—বিআইপির এই সতর্কবার্তা স্থানীয় প্রশাসন, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের জন্য সূচক হিসেবে কাজ করবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।