ঢাকা বাজারে ও সাধারণ মানুষের টেবিলে ইলিশ সংকট
বর্ষার প্রধান ইলিশ মৌসুম শেষের পথে থাকলেও দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ তীব্রভাবে কমেছে। মৎস্য বিভাগের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে তা বেশির ভাগই ছোট আকারের এবং বাজারদামও অনেকের নাগালের বাইরে। ফলত ভরা মৌসুমেও ঢাকাবাসীর অনেকের পাতে উঠে না ইলিশ—একেকজন ক্রেতা-বিক্রেতা ও বাজার পর্যবেক্ষণ এসব পরিসংখ্যান মেলে।
মৎস্য বিভাগ ও ইলিশ গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নাব্যতা সংকট, নদীদূষণ, প্রজনন পরিবেশের ক্ষত, এবং নির্বিচারে জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা। এসব কারণে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ইলিশ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ও মাছের গড় আকার কমেছে।
উৎপাদন রেকর্ড ও পতনের চিত্র
সরকারি তথ্যের ধারাবাহিকতা থেকে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণে সামান্য উন্নতি ঘটলেও এর পরবর্তী বছরগুলোতে পতন শুরু হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকে—
| অর্থবছর | ইলিশ আহরণ (লক্ষ টন) |
|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ৫.৩২ |
| ২০১৯-২০ | ৫.৫০ |
| ২০২০-২১ | ৫.৬৫ |
| ২০২১-২২ | ৫.৬৬ |
| ২০২২-২৩ | ৫.৭১ |
| ২০২৩-২৪ | ৫.০২৯৪৮৭ (টন) |
| ২০২৪-২৫ | প্রায় ৫.০০ (টন) |
টেবিল থেকে দেখা যায়, সর্বশেষ অর্থবছরে মোট আহরণ আগের তুলনায় কমে প্রায় পাঁচ লাখ টন-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে—যা উদ্বেগ বাড়ানোর মতো।
মাছের গড় আকারে নাটকীয় পতন
ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক দুই বছরে কেবল উৎপাদনই কমেনি, মাছের গড় ওজনও কমেছে। তিনি বরাতে বলা হয়েছে, যেখানে আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৪০০–৪৫০ গ্রাম, এখন তা নেমে এসেছে ৩০০–৩৫০ গ্রাম। এতে ঢাকার বাজারে বিক্রেতারা ছোট আকারের মাছ বিক্রি করলেও ভোগে গুণগত ও আর্থিক প্রভাব পড়ে।
"জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং প্রজননের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব পড়ছে ইলিশের ওপর,"—বলেন গবেষক।
খুলনা জেলা মৎস্য অফিসার মো. বদরুজ্জামান প্রতিবেদনে বলেন, একটি ইলিশ সাধারণত এক থেকে দেড় বছর সময় নেওয়ায় পূর্ণবিকাশে পৌঁছায়। নদীতে ডিম থেকে পোনা সাগরে চলে যায়, পরিণত হয়ে আবার মিঠাপানিতে ফিরে ডিম দেয়। তবে অতিরিক্ত ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের পাশাপাশি বালু উত্তোলন, শিল্প দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এই জীবনচক্রকে ব্যাহত করছে।
- নৃতাত্ত্বিক ও প্রজনন বাধা: পোনা সাগরে যাওয়া ও ফিরে আসা পুরো প্রক্রিয়া বিঘ্নিত।
- মানুষিক অনুশীলন: নিষিদ্ধ জাল ও অতিরিক্ত আহরণ পোনার টিকে থাকা রোধ করছে।
- পরিবেশগত চাপ: নদী ও সমুদ্র তাপমাত্রা ও দূষণের কারণে প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত।
ঢাকার বাজার ও ভোক্তা পাঠকের প্রভাব
ঢাকায় বিশ্বের মতোই ইলিশকে জনপ্রিয় মাছ হিসেবে দেখা হয়—বাঙালির তাজা ইলিশের চাহিদা সব সময়ই বেশি। কিন্তু সরবরাহ যখন কমে যায়, ঢাকার পাইকারী ও খুচরা বাজারে দাম বাড়ে ও ছোট মাছ বেশি বিক্রয়ে আসে। এতে মধ্য- এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ইলিশ ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া বিক্রেতারা ছোট মাছ বিক্রি করে পরিমাণ পূরণ করলেও ভোক্তা মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
মৎস্য বিভাগের সুসংগঠিত নজরদারি, নদীর পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ ও কার্যকর গবেষণার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে—এমনই পরামর্শ দেন প্রতিবেদনে উল্লিখিত গবেষকরা। ঢাকাবাসীর টেবিলে ইলিশ ফিরিয়ে আনার জন্য নদী ও উপকূলীয় এলাকায় তৎপরতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
এ সীমিত তথ্য ও মৎস্য বিভাগের রিপোর্টের আলোকে ঢাকার বাজারে ইলিশের স্বল্পতা ও তার সম্ভাব্য ফলাফল তুলে ধরা হলো। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিবেশ রক্ষা, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কঠোর আইন প্রয়োগ কার্যকর হতে হবে।