মিরপুরে গত ৩১ মে তাঁর নিজ বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নানা তথ্যকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন নিহতের ছোট ছেলে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক একেএম আশিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তাদের মানসিক কষ্টকে বাড়িয়েছে।
পরিবারের অবস্থান ও বিজ্ঞপ্তি
বুধবার (৩ জুন) এক গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে আশিকুর রহমান জানান, মায়ের মৃত্যু পরিবারকে গভীর মানসিক আঘাতে ফেলেছে। ঘটনার পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যামে যে ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে, তা পরিবারের পরিস্থিতিকে আরও ভোগাচ্ছে। তিনি বলেছেন, মায়ের দেখাশোনা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তা সঠিক নয়।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান বলেছেন, ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় তার মা তার সঙ্গেই ছিলেন এবং করোনাকালের সময়ও তিনি মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। ২০২৪ সাল থেকে মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার সঙ্গে থাকাকালীনই বাসায় অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তিনি সংশ্লিষ্টতাকে অস্বীকার করেছেন।
“মায়ের অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করছি। ২০০৯ সাল থেকে মা আমার সঙ্গে ছিলেন। করোনাকালেও আমি মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি,”
পুলিশ ও ফোরেনসিক পর্যবেক্ষণ
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামছুর রহমান জানান, জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গেলে বাসাটি বসবাসের অনুপযোগী অবস্থায় দেখতে পান। পুলিশকে খবর দেয়ার পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসআই শামছুর রহমান জানান, মরদেহে ডান চোখ ও পিঠে পোকা দেখা গেছে—একটি পর্যবেক্ষণ যা পরিবারের বক্তব্য থেকে ভিন্ন।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান পুলিশের এই পর্যবেক্ষণ অস্বীকার করেছেন এবং বলেন, ঘটনার দিন বিকেলে তার বোন ফাতিমা নাসরীন ফোন করে জানান মায়ের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। পরে তারা একজন নার্সকে ডেকেছেন, পুলিশকে খবর দিয়েছেন এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন।
পরিবারিক পরিস্থিতি ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিবরণ
আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, ফাতিমা নাসরীনের কোনো সন্তান নেই। তাদের বাবা মো. আবুল কাশেম ২০০৮ সালে মারা যান। ২০১৭ সালে ফাতিমার স্বামীর মৃত্যু সাপেক্ষে ফাতিমা এবং মায়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানসিকভাবে কিছু জটিলতা ছিল—যা তিনি সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে কোনো ব্যাক্তিকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে নেয়া হয়নি।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বাইরের গৃহকর্মী রাখতে ফাতিমা ইচ্ছুক ছিলেন না। আশিকুর একাধিকবার সহায়তার চেষ্টা করলেও তা স্থায়ীভাবে সম্ভব হয়নি। এছাড়া মাও অন্যের হস্তক্ষেপ পছন্দ করতেন না—এই কারণে বাড়ির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ ছিল বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক প্রভাব
মৃত্যুর সংবাদ এবং পরে বাসার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। মানুষ যে কোন কারণেই হোক কোনো বৃদ্ধার প্রতি অবহেলা-উপেক্ষার ঘটনা দেখলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়; এ ঘটনার ক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা গেছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে উঠে আসা বিবরণ পুলিশি রিপোর্টের সঙ্গে মেলেনি বলে মতামতও রয়েছে।
স্থানীয় আলোকপাতের জন্য দুটি বিষয় স্পষ্ট—একটি হলো পরিবারের অভ্যন্তরীন ব্যবস্থাপনা ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে সচেতনতার অভাব, এবং দ্বিতীয়টি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই করার প্রয়োজন।
- ঘটনার সময়সূচি:
তারিখ/সময় ঘটনা ৩১ মে (রাত) নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার ৩১ মে (বিকেল) ফাতিমা নাসরীন ফোন করে জানান মায়ের সাড়া নেই পরবর্তী নার্স ডাকা হয়, পুলিশকে জানানো হয় এবং আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয় - দাবি-নিরীক্ষা: পরিবার পুলিশ পর্যবেক্ষণের কিছু দিক অস্বীকার করেছে; পুলিশ মরদেহের অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা ভিন্ন বলেছে।
আগামী ধাপ
এই ঘটনায় পুলিশ ও ফোরেনসিক শনাক্তকরণ, মৃত্যুর কারণ নির্ণয় এবং সামাজিকভাবে ছড়ানো তথ্য যাচাই—এই তিনটি দিকেই নজর রাখছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগের ভুল তথ্য হিসেবে অভিযুক্ত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এ মামলার অন্যতম সত্য নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও পেশাগত তদন্ত-প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া জরুরি — তা না হলে সংশয় ও আক্ষেপ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে থেকে যেতে পারে, এবং পরিবারের মানসিক ক্ষত আরও গভীর হবে।
নোট: প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য সূত্রভিত্তিক; বিবৃতি ও পুলিশের পর্যবেক্ষণের কথা প্রতিলিপি করা হয়েছে।