বরগুনা জেলার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট চলমান রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে—অনুমোদিত মোট ৮১টি চিকিৎসক পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন; ফলে শূন্য রয়েছে ৬৬টি পদ।
চলতি পরিস্থিতি ও কার্যব্যবস্থার মারাত্মক প্রভাব
হাসপাতালের ব্যস্ততা বিবেচনায় সেখানে প্রতিদিন গড়ভাবে বহির্বিভাগে প্রায় ৬০০ জন ও অন্তর্বিভাগে প্রায় ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এই বোঝা সামলাতে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর অবস্থার চাপে রয়েছে। হাসপাতালের একাংশ সূত্র জানাচ্ছে, এক জন চিকিৎসককে দিনে ১০০ থেকে ১৫০ বা তারও বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে—যার ফলে প্রত্যেক রোগীকে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ শূন্যতা ও রেফার গ্রহণের বাধ্যবাধকতা
হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, অর্থোপেডিকস, চক্ষু, নাক-কান-গলা ও অ্যানেস্থেসিয়া—এই বিভাগের অধিকাংশে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ না থাকায় জটিল রোগীকে বরিশাল ও ঢাকার বৃহৎ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। একই কারণে বহু অস্ত্রোপচার কার্যক্রমও সীমিত বা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকাহ, হাসপাতালের আবাসিক সার্জন: “চিকিৎসক সংকটের কারণে বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ রোগী দেখতে হচ্ছে। এত বেশি রোগীর চাপের মধ্যে প্রত্যেককে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।”
আরএমও (রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার) ডা. মাহমুদ মুরশীদ আল মামুন একই বাস্তবতার উপর জোর দিয়ে বলেন, মাত্র দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
অতীতের পদোন্নতি, বর্তমান বাস্তবতা
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যা এ উন্নীত করা হয়েছিল। তবে শয্যা বৃদ্ধির পরও অনুপাতে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিযুক্ত করা হয়নি। ফলে স্থানের পরিসর বেড়েছে, কিন্তু মুলসামর্থ্য বৃদ্ধির ব্যাবস্থা না থাকায় সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তাত্ক্ষণিক উদ্যোগ ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবু ফাত্তাহ বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং জানান যে শূন্য পদের পূরণের জন্য প্রতি মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে সমস্যার সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংক্ষেপে প্রধান চিহ্নিত তথ্য
- অনুমোদিত চিকিৎসক পদ: ৮১টি
- বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক: ১৫ জন
- শূন্য পদের সংখ্যা: ৬৬টি
- বহির্বিভাগে দৈনিক রোগী: প্রায় ৬০০
- অন্তর্বিভাগে দৈনিক রোগী: প্রায় ৩৫০
| বিবরণ | সংখ্যা |
|---|---|
| অনুমোদিত চিকিৎসক পদ | ৮১ |
| কর্মরত চিকিৎসক | ১৫ |
| শূন্য পদ | ৬৬ |
স্থানীয় প্রভাব ও রোগীর পরামর্শ
চিকিৎসকসংকটের ফলে রোগীরা কক্ষ করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন এবং জরুরি বা জটিল রুগীর দ্রুত মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হচ্ছে। ফলে রোগীর স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত চাপ এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে—কারণ রেফারের ফলে উচ্চবিত্ত শহরে যেতে হচ্ছে।
রোগী ও স্বজনদের জন্য স্থানীয়ভাবে কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ:
- প্রয়োজনে আগেভাগে টেলিফোন করে ডাক্তারের সময় জানতে চেষ্টা করুন।
- জটিলতা অনুভব করলে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।
- নিয়মিত রোগী ও গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে জেলায় মেডিকেল ক্যাম্প বা ক্লিনিক চললে সেগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে সদ্য জানুন।
চিকিৎসক সংকটের সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ না হলে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম ও স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার মান দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণে প্রকৃতসমর্থ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় রোগীদের ভোগান্তি বৃদ্ধি পাবে—এমনই উদ্বেগ হাসপাতাল ও স্থানীয় জনসাধারণের।