বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল—উপকূলীয় বরগুনা জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান প্রতিষ্ঠান—দীর্ঘদিন ধরে তীব্র চিকিৎসক সংকটে ভুগছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত ৮১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৫ জন, ফলে রোগীদের মুলতুবি রাখা, বহির্বিভাগে দীর্ঘ অপেক্ষা ও জটিল ক্ষেত্রে বাইরে রেফার করা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পদের বাস্তব চিত্র
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সূত্রের তথ্য অনুযায়ী:
- অনুমোদিত মোট চিকিৎসক পদের সংখ্যা: ৮১
- বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক: ১৫
- মেডিকেল অফিসার পদ (অনুমোদিত ৫৫): দীর্ঘমেয়াদে শূন্য রয়েছে ৪৭
- কনসালটেন্ট/বিশেষজ্ঞ পদ (অনুমোদিত ১৭): কর্মরত আছে মাত্র ২
| পদধারার নাম | অনুমোদিত সংখ্যা | বর্তমানে কর্মরত | শূন্যপোস্ট |
|---|---|---|---|
| মোট চিকিৎসক পদ | ৮১ | ১৫ | ৬৬ |
| মেডিকেল অফিসার | ৫৫ | ৮ | ৪৭ |
| কনসালটেন্ট/বিশেষজ্ঞ | ১৭ | ২ | ১৫ |
সেবা কোথায় কফজেড় হচ্ছে
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশুবিদ্যা, অর্থোপেডিকস, চক্ষু, নাক-কান-গলা ও অ্যানেসথেসিয়া—এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট রয়েছে। ফলে অনেক জরুরি এবং পরিকল্পিত অস্ত্রোপচারও নিয়মিতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। জটিল রোগীদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রেফার করা হচ্ছে, যা রোগীর ভোগান্তি ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়াচ্ছে।
রোগী ও স্বজনরা যা বলছেন
হাসপাতালে এসে সেবা না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়া রোগী ও তাদের স্বজনরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সদর উপজেলার মাইঠার গ্রামের মো. সাইদুল ইসলাম বলেন,
“সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও যদি বরিশালে যেতে হয়, তাহলে দরিদ্র মানুষের জন্য এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? চিকিৎসকের অভাবে আমরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছি।”
এক প্রসূতির স্বজন রেশমা আক্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে জানিয়েছেন, গাইনি বিভাগের বিশেষজ্ঞের অভাবের কারণে জরুরি প্রসূতি রোগীদের অনেক সময় বাইরে পাঠাতে হয় এবং এতে জীবনঝুঁকির আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও অধিকার ফোরামের উদ্বেগ
বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সহসভাপতি হারুন আর রশিদ হাওলাদার এই সংকটকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, দ্রুত শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ ও বিশেষজ্ঞদের পদায়ন জরুরি। তিনি আরও বলছেন যে প্রান্তিক ও উপকূলীয় এলাকায় কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রভাব ও বাস্তবতা
হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের সরাসরি প্রভাবগুলো: দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ছোট সমস্যায়ও রোগীদের বাইরে রিফার করা, বাড়তি আর্থিক ব্যয় এবং জরুরি ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি। উপকূলীয় জেলা হওয়ায় জরুরি পরিবহন ও ভ্রমণসংক্রান্ত অসুবিধা বাড়ে—যা রোগীর স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে বড় বাধা তৈরি করে।
কী করা প্রয়োজন (সূত্রভিত্তিক দাবি)
- শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ ও প্রান্তিক এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ প্রণোদনা নিশ্চিত করা।
- হাসপাতালের কার্যক্রম স্বচ্ছ রাখতে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি।
হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট ও তার প্রভাব নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিক্রিয়া এই রিপোর্টে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরবর্তী প্রতিবেদন যোগ করা হবে।
রিপোর্টার: ডা. শারমিন আক্তার, বরগুনা