সিলেটে শিক্ষা গ্রহণে অনীহা বাড়ছে এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেড়েছে—এমন চিত্রই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক শিক্ষা-বোর্ডের পরিসংখ্যান থেকে। ২০২১ সালে বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ১,১৯,৫৫৩; ছয় বছর পর এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯,০৭৯-এ। গত ছয় বছরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মোট ২৫.৪৯ শতাংশ কমেছে।
কোন ধাপেই শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে? — জমাট কারণগুলো
শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক পর্যবেক্ষকরা একাধিক কারণ তুলে ধরেন। তার মধ্যে প্রধানত:
- কয়েকটি নিম্ন-আয় পরিবারে প্রাথমিক স্তরের পরে সন্তানদের চাকরি বা পরিবারের জীবিকাসহায়তায় যুক্ত করা হচ্ছে;
- করোনার প্রভাবে পড়াশোনা বন্ধ ও আর্থিক দুরবস্থার সুষম প্রতিক্রিয়া এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি;
- মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তুসংস্থান ও কর্মসংস্থানের আকর্ষণ কিছু পরিবারের কাছে দ্রুত আয় নিশ্চিত করার পথ বলে ধরা হচ্ছে।
স্থানে-স্থানেই শিক্ষক ও বিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পরই অনেক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষা ত্যাগ করে কাজের খোঁজে যায়—এবং একবার ঝরে পড়লে আবার ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।
পড়াশোনার ক্ষতি কি শুধু সংখ্যাতত্ত্বে আটকে থাকবে?
শিক্ষা-কমে গেলে তা ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। কর্মশক্তির যোগ্যতা কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসা, সেবা ও প্রশাসনে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি দেখা দেবে—এমন আশঙ্কা শিক্ষাবিদদের। তারা ইঙ্গিত করেন, যদি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও আয়-উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে।
স্থানীয় প্রশাসন ও বোর্ডের ভূমিকা
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, করোনার সময় থেকেই চলতি পতন শুরু হয়। তবে শিক্ষাবোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কতৃপক্ষ যদি দ্রুত উদ্যোগ না নেয়, তাহলে মাধ্যমিক পর্যায়ে হারানো প্রতিভা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল শিক্ষাবোর্ডের নির্বাচনমুখী বা পরীক্ষামুখী উদ্যোগ নয়—সামাজিক নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অনুপ্রেরণা কাজের পরিকল্পনা দরকার।
স্থানীয় প্রেক্ষিত: কী করা যায় — প্রস্তাবিত অনুরোধগুলো
শিক্ষাবিদরা স্থানীয় সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ মানতে বলছেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:
- নিম্ন আয়ের পরিবারকে লক্ষ্য করে আর্থিক অনুদান বা বৃত্তি কর্মসূচি চালু করা;
- বিদ্যালয়-সমাজ সম্পর্ক জোরদার করে অভিভাবকদের সঙ্গে সচেতনতা বাড়ানো;
- শিক্ষার্থীদের অর্ধ-সময়ের কাজকে নিয়মিতকরণ করে পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা;
- প্রাথমিক পর্যায়ে ছিন্নমূল পরিস্থতিতে ফের শিক্ষায় ফেরানোর জন্য স্থানীয় সমন্বিত উদ্যোগ।
শিক্ষাবিদদের বক্তব্য, ঝরে পড়ার হার কমাতে সঠিক উদ্যম না নিলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে।
| সাল | এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা |
|---|---|
| ২০২১ | ১,১৯,৫৫৩ |
| ২০২৬ | ৮৯,০৭৯ |
| ছয় বছরের পরিবর্তন | -২৫.৪৯% |
উপরে দেওয়া সংখ্যাগুলো সিলেট শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত তথ্যে ভিত্তি করে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা ও স্থানীয় সচেতনতা
সমাজে শিক্ষা-সংক্রান্ত অবহেলা প্রতিরোধে স্থানীয় গণমাধ্যম, এনজিও এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। শিক্ষার মূল্য সম্পর্কে পরিবারের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে পাঠ্যশিক্ষা ও জীবিকা দুটোই নিশ্চিত করা সম্ভব।
সিলেটে শিক্ষার হার কমার এই প্রবণতা শুধুমাত্র বেসরকারি সমস্যা নয়—এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন স্তরের সংকেত বহন করে। স্থানীয় নেতৃত্ব ও নীতি-নির্ধারকদের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।