ফেনী এলাকায় চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি–জুলাই) সর্বমোট শতাধিক বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি ঘটেছে বলে ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলা ও পাঁচটি পৌরসভা অঞ্চল থেকে চোরাচালান বৃদ্ধির ফলে গ্রাহকরা দীর্ঘ সময় বৃষ্টির দিনে-রাতেই বিদ্যুৎবিহীন অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং নতুন ট্রান্সফরমার বসাতে ন্যূক্যতি টাকা প্রদানের জন্য আর্থিক দিশাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি কি কোথায়?
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ফেনী সদর। তদন্তে দেখা গেছে, সদর উপজেলায় ৫৮টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। ছাগলনাইয়ায় ৩৬টি, পরশুরামে ৩টি, সোনাগাজীতে ২টি এবং দাগনভূঞায় ১টি চুরির ঘটনা আছে।
| উপজেলা/এলাকা | চুরির সংখ্যা (জানুয়ারি–জুলাই) |
|---|---|
| ফেনী সদর | ৫৮ |
| ছাগলনাইয়া | ৩৬ |
| পরশুরাম | ৩ |
| সোনাগাজী | ২ |
| দাগনভূঞা | ১ |
চোরচক্র কেমন কাজ করছে ও আর্থিক প্রভাব
সূত্র বলছে, সাধারণত গভীর রাতে চোরেরা বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে ট্রান্সফরমারের খোলাসহ ভেতরের তামা, কয়েল ও দিলগুলি প্রাধান্য দিয়ে নিয়ে যায়। বাকি খোলস ফেলে রেখে দিয়ে যায়। বাজার মূল্য বিবেচনায় প্রতিটি ট্রান্সফরমারে থাকা অংশের মূল্য অনেক—এ মন্তব্য স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা করেছেন। বিভিন্ন শক্তিমাপের ট্রান্সফরমারের আনুমানিক মূল্য প্রতি প্রতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী:
- ৫ কেভিএ: প্রায় ৫৩ হাজার টাকা
- ১০ কেভিএ: প্রায় ৮৩ হাজার টাকা
- ১৫ কেভিএ: প্রায় ১ লাখ টাকা
- ২৫ কেভিএ: প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা
বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী কোনো স্থানে প্রথমবার ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুনটি বসাতে গ্রাহককে মূল্যবলের ৫০ শতাংশ টাকা জমা দিতে হয়; কিন্তু একই স্থানে দ্বিতীয়বার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের পুরো খরচই গ্রাহককে বহন করতে হয়। এই বিধান নারী, বৃদ্ধ ও ক্ষুদ্র আয়ের গ্রাহকদের জন্য ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
গ্রাহকদের কণ্ঠঃ দৈনন্দিন বাধ্যবাধকতা ও ক্ষোভ
"মাসখানেক আগে বাড়ির পাশের ট্রান্সফরমারটি চুরি হয়ে গেছে। নিয়মিত বিল দিলেও নতুন ট্রান্সফরমার কেনার জন্য এককালীন এত টাকা জোগাড় করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে,"
এই অভিযোগ করেছেন ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সারোয়ার হোসেন। অন্য এক স্থানীয়—উত্তর কুহুমা গ্রামের ইসমাইল মিথুন—বলেন, মসজিদের সামনের ২৫ কেভিএ ট্রান্সফরমার চুরির পর মসজিদসহ ৬৩টি পরিবারের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল এবং নতুন ট্রান্সফরমার বসাতে তাঁরা ৮১ হাজার টাকা জমা করেছেন।
স্থানীয় উদ্যোগ ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
চুরি রোধে অনেক এলাকায় গ্রাহকরা নিজেদের উদ্যোগে অর্থ তুলে কারিগর দিয়ে ট্রান্সফরমার বা খুঁটির মুখে লোহা ঝালাই করে রাখছেন। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম-প্রশাসন) আবদুল আউয়াল জানিয়েছেন, প্রতিটি চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে এবং গ্রাহকদের সচেতন করার জন্য প্রচারণা চলছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িত চক্র শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। তিনি বলেন, চোরাচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও করণীয়
অবস্থানগত কারণে গ্রামীণ ও পল্লী এলাকায় ট্রান্সফরমারগুলো রাত্রে সংরক্ষিত নয়—তার ওপরই চুরি সহজ হয়ে উঠছে। ফলে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সরবরাহ ব্যাহত ও জনদুর্ভোগ বাড়বে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
- সংবেদনশীল স্থানে স্থায়ী নজরদারি (নাইট প্যাট্রোল) বাড়ানো।
- ট্রান্সফরমার ও খুঁটি সুরক্ষায় কস্ট-এফেক্টিভ লকিং ও মেটাল কভারিং ব্যবহার।
- গ্রাহক-নির্ভর অতিরিক্ত এককালীন ব্যয় কমানোর জন্য আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি ব্যবস্থার প্রস্তাব করা।
ফেনী জেলায় এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বিদ্যুৎ সেবা ব্যাহত থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ব্যাপক প্রভাব পড়বে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মিলিয়ে কাজ না করলে চোরাচক্র আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
রিপোর্টার, ফেনী থেকে: আবদুল হালিম, ফেনী প্রতিনিধি