নাটোর জেলায় চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের কেউই পাস করতে পারেনি। ফলাফল প্রকাশের পর জেলার শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করেছে।
পরিস্থিতি ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক পরীক্ষার্থী অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ফলাফলে একেবারেই সফল হয়নি। দ্রুত কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পাঠদান পদ্ধতি পর্যালোচনার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঞ্চদিবসের মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুস্তম আলী হেলালী জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করে কেন এমন দুর্বল ফলাফল হয়েছে তা তদন্ত করা হবে এবং নির্বাচনী পরীক্ষার প্রতিটি খাতা পুনরায় যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানসমূহ ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা
জেলা শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্যে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্নভাবে নীচের স্থানগুলোতে শতভাগ ফেল রেকর্ড করা হয়েছে:
- লালপুরে নন-এমপিও মোহরকয়া দাখিল মাদ্রাসা — ৫ পরীক্ষার্থী
- লালপুরে নন-এমপিও বিলমাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা — ৫ পরীক্ষার্থী
- বাগাতিপাড়ায় এমপিওভুক্ত চিথলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় — অংশগ্রহণ ছিল (সামগ্রিক) ৪৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে
- বাগাতিপাড়া নন-এমপিও তমালতলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ — একই অংশগ্রহণের আওতায়
- বাগাতিপাড়া বাগাতিপাড়া পৌর মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ — একই গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত
- বড়াইগ্রামে এমপিওভুক্ত কুমারখালী দাখিল মাদ্রাসা — ৪৩ পরীক্ষার্থী
- বড়াইগ্রামে নন-এমপিও কুমরুল দাখিল মাদ্রাসা — একই জেলায়
- বড়াইগ্রামে আটুয়া কেএস দাখিল মাদ্রাসা — একই ফলাফল
- সিংড়া উপজেলা থেকে কলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ — অংশগ্রহণ ছিল (সামগ্রিক) ৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে
- সিংড়ার বাহাদুরপুর দাখিল মাদ্রাসা — একইভাবে
| উপজেলা/এলাকা | প্রতিষ্ঠান | পরীক্ষার্থীর সংখ্যা (রিপোর্ট অনুযায়ী) |
|---|---|---|
| লালপুর | মোহরকয়া দাখিল মাদ্রাসা, বিলমাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা | ৫, ৫ |
| বাগাতিপাড়া | চিথলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়; তমালতলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ; পৌর মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ | সমষ্টিগত ৪৬ |
| বড়াইগ্রাম | কুমারখালী দাখিল; কুমরুল দাখিল; আটুয়া কেএস দাখিল মাদ্রাসা | সমষ্টিগত ৪৩ |
| সিংড়া | কলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ; বাহাদুরপুর দাখিল মাদ্রাসা | সমষ্টিগত ৫১ |
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মন্তব্য
স্থানীয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সুবিধ কুমার মৈত্র বলেছেন, এটি কেবল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং বৃহত্তর শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সতর্ক সংকেত। তিনি শিক্ষকের জবাবদিহিতা বাড়ানো, ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য টিউটোরিয়াল বা সহায়ক কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
"শতভাগ ফেল শুধু স্কুলের কাহিনি নয়। এটি সমগ্র ব্যবস্থার কচ্ছপগতির ইঙ্গিত। মোবাইল ফোনে আসক্তি ও অনিয়মিত উপস্থিতি প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে,"
অধ্যাপক মৈত্রের মন্তব্যে শিক্ষার্থীদের পরিবারের ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, শিক্ষকদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে যাতে পড়াশোনায় মনযোগ ফিরতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া
কুমারখালী দাখিল মাদ্রাসার সুপার আহমাদুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির পর এ রকম সম্পূর্ণ ব্যর্থতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক; গত বছরের তুলনায় ফলাফলে ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। তিনি জানান, জেলা কর্তৃপক্ষের শোকজ পেয়েছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেবেন।
ফলাফল ঘিরে শিক্ষার্থীর মনোবল ও আশাব্যর্থ অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষকরাও উদ্বিগ্ন যে, কিভাবে দ্রুত শিক্ষার মানোন্নয়ন করে পরবর্তী বছরগুলোতে ফলাফল উত্তরণ সম্ভব করা যাবে।
সামনের পথ: কী করা হতে পারে
স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে নিম্নলিখিত কয়েকটি কাজ জরুরি:
- প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরীক্ষা ও পাঠপরিকল্পনা মূল্যায়ন;
- দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট টিউটরিং ও বাড়তি ক্লাস;
- শিক্ষক-অভিভাবক বৈঠক নিয়মিত করা এবং উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা তদারকি;
- পরীক্ষার খাতা পুনরায় যাচাই এবং যদি খাতা-সংক্রান্ত কোনো অনিয়ম থাকে তা খতিয়ে দেখা।
জেলার শিক্ষা বিভাগও জানিয়েছে যে, প্রয়োজনমতো এলাকায় বিশেষ মনিটরিং টিম পাঠানো হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা বাহ্যিক সহায়তা ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নাটোর থেকে বিশ্বস্ত সূত্রে জানায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট না দিলে শিক্ষাবিভাগ তদতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট দ্রুত মোকাবিলা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে — তাই স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।