লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার চেষ্টা করার সময় খাবার ও পানির সংকট ও নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ায় অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু ও কয়েকজন নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত ছয় জন যুবক এখনো ছেলে-মেয়েদের মতো নিখোঁজ রয়েছেন, শোকে ভেঙে পড়েছে তাদের পরিবার।
পরিস্থিতি ও উদ্ধারকাজ
স্থানীয় ও জাতীয় প্রতিনিধিদের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে মোট ৪২ জন অভিবাসীকে নিয়ে এক নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। তাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে জানা যায় ৩৮ জনই বাংলাদেশি। সাগরে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে পড়ার পর নৌকার খাবার ও পানি শেষ হয়ে যায় এবং পরে গ্রিসের কাছাকাছি গিয়ে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। প্রায় নয় দিন সাগরে ভাসার পর নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে; তবুও দলের মধ্যে অনেকের খোঁজ মেলেনি বলে পরিবার-স্বজন জানিয়েছেন।
শান্তিগঞ্জের পরিবারগুলোর আহাজারি
নিখোঁজদের মধ্যে নাম পাওয়া গেছে— পশ্চিম পাগলার শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন, রনসী গ্রামের মো. তালহা এবং দরগাপাশার সিচনী গ্রামের সাগর পাল। গত ৩১ জুলাই হৃদয়ের সঙ্গে রন্টু পালের শেষ কথা হয়; এরপর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
"গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সাথে মোবাইলে কথা হয়েছিল। এ‑টাই ছিল তার সঙ্গে শেষ কথা, এখন আর কোনো খোঁজ নেই,"
নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায় কিছু অভিবাসনচক্রের মাধ্যমে তাদের বিদেশ পাঠানো হয়েছে; অনেকেই মানবপাচারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে উচ্চসংখ্যক অর্থ প্রদান করে রুট বেঁধে যুক্ত হয়েছিলেন। হৃদয়ের বাবা জানিয়েছেন হৃদয়কে প্রথমে ঢাকা থেকে ভারত, এরপর শ্রীলংকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
উদ্ধারকৃতদের বর্ণনা ও শারীরিক অবস্থা
মিশরে উদ্ধার হওয়া দল থেকে কিছু মানুষকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। উদ্ধৃত এক উদ্ধারপ্রাপ্ত ব্যক্তি শান্তিগঞ্জের পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল করিম জানিয়েছেন তারা নৌকা ছাড়ার সময়ই খাবার ও পানির মজুত হারিয়ে ফেলেন এবং ইঞ্জিন নষ্ট হলে প্রকট বিপদে পড়েন। সূত্রের কথা খুঁটিনাটিভাবে প্রকাশ করা হয়েছে; সরকারের ও কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ, উদ্ধারকাজ ও সমন্বয় যে কীভাবে হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য মেলেনি।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পদক্ষেপ
শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের একটি টিম নিখোঁজদের পরিবারের বাড়ি পরিদর্শন করেছে এবং প্রাথমিক খোঁজখবর নিয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে স্বজনরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত খোঁজ এবং নিখোঁজদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কামনা করেছেন।
- ঘটনার তারিখ: নৌকা রওনা ৩ আগস্ট; পরিবারের কাছে নিখোঁজদের খবর পাওয়া ১৬ আগস্ট
- নৌকায় থাকা মোট অভিবাসী: ৪২ জন (তাদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৩৮ জন বাংলাদেশি)
- শান্তিগঞ্জের নিখোঁজ যুবকদের সংখ্যা: ৬ জন
স্থানীয় প্রভাব ও মানবিক দিক
শান্তিগঞ্জের নিম্ন ও মধ্যবর্গীয় বিভিন্ন পরিবারে বৈদেশিক আয় ও জীবিকার প্রত্যাশা থাকায় অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমান। এই ঘটনায় স্থানীয় সমাজে শোক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নিখোঁজদের আত্মীয়রা দ্রুত তথ্য ও সমাধান চাচ্ছেন— পদ্ধতিগতভাবে কোনসংস্থার মাধ্যমে যোগাযোগ থাকবে, কিভাবে কনসুলার সহযোগিতা পাওয়া যাবে, এবং মানবপাচারের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে কড়া তৎপরতা নেওয়া হবে কি না—এসব প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় নেতারা ও পরিবারগুলো জাতীয় পর্যায়ের সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছে। এ টানে দালাল ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তদন্ত জোরদার করার দাবি উঠেছে।
| নিখোঁজের নাম | গ্রাম/ইউনিয়ন |
|---|---|
| হৃদয় পাল | পশ্চিম পাগলা, শত্রুমর্দন |
| এনামুল খাঁন | পূর্ব পাগলা, চিকারকান্দি |
| রিপন মিয়া | চিকারকান্দি (পূর্ব পাগলা) |
| মামুন খাঁন | চিকারকান্দি (পূর্ব পাগলা) |
| মো. তালহা | রনসী গ্রাম |
| সাগর পাল | দরগাপাশা, সিচনী |
এই ঘটনার মানবিক ও আইনগত পরিণতি কেমন হবে, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবারগুলো আতঙ্কিত। সরকারের কনসুলার বিভাগ, ফরেন অফিস এবং মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত নিখোঁজদের সন্ধান এবং প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায়গুলো খোঁজার দাবি উঠেছে।
শান্তিগঞ্জের পরিবারগুলো এখন শুধু একটাই চেয়ে আছেন— নিখোঁজ যুবকদের নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া এবং যাদের জীবনহানি হয়েছে তাদের ব্যথা ও ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার জন্য যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা।