বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে চলা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছেন। জেলা প্রশাসন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও চিকিৎসক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাড়ে তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভা শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠক ও প্রত্যাহারের কারণ
শজিমেক হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, পুলিশ, হাসপাতাল পরিচালনা পরিষদ কিংবা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা এবং রাজনৈতিক নেতারা। সভার পরে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মনজুর এ মুর্শেদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। স্থানীয়ভাবে ইন্টার্ন চিকিৎসক রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধও কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানান।
বৈঠকে কর্তৃপক্ষের দেওয়া আশ্বাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- বহিরাগত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দলীয় শাস্তি নিশ্চিত করা হবে;
- হাসপিটালে আর্মড আনসার মোতায়েন করা হবে;
- সার্বক্ষণিক পুলিশ ডিউটি থাকবে, নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাদের আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
ঘটনাটি শুরু হয় মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটার দিকে, যখন মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা এক রোগী আব্দুল মালেক (৫৫) নামের ওই রোগীর মৃত্যুর পর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের কথা কাটাকাটি হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর স্বজনেরা বর্মিজ চাকু ও লোহার রড নিয়ে হামলা চালান এবং এ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রীও ভাঙচুর করা হয়। এতে কমপক্ষে ২১ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন।
“ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর গোষ্ঠীগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নেই—এভাবেই আমরা আর কাজ চালিয়ে যেতে পারি না,”
ওই হামলার ঘটনায় হাসপাতাল প্রশাসন বুধবার ভাঙচুর ও চুরির অভিযোগে সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করে এবং অজ্ঞাতনামা অন্যান্যদের আসামি করা হয়। পুলিশ তদন্তে এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সামাজিকগত প্রভাব ও রোগীর ভোগান্তি
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির সময় হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে অবস্থান নেওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগী সমস্যায় পড়েন। কর্তৃপক্ষ জানায়, বিশেষ করে বহির্বিভাগ পরিষেবা কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হলে ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়ে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিরূপ প্রভাব পড়ে।
রোগী ও অংশ নেওয়া স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসক-চিকিৎসাসেবাদানকারীর নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি বলে চিকিৎসা মূল্যায়করা উল্লেখ করেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মনজুর এ মুর্শেদ пресс ব্রিফিংয়ে বলেন, বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে এবং আলোচনা শেষে নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এসব আশ্বাসের ভিত্তিতেই ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতি সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছেন।
| বিষয় | উল্লেখ্য |
|---|---|
| কর্মবিরতি সময় | প্রায় ৪০ ঘণ্টা |
| আহত ইন্টার্ন চিকিৎসক | কমপক্ষে ২১ জন |
| মামলায় নাম জাতান্তর | সাতজনের নাম উল্লেখ; অজ্ঞাতনামা অর্ভুক্ত |
| গ্রেপ্তার | ছয়জন |
এই ঘটনার পরে হাসপাতালের প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন একসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।
পর্যালোচনা ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
হাসপাতালে সহিংসতা বা ভাঙচুর হলে তা কেবল নির্দিষ্ট চিকিৎসকদের ভুক্তভোগী করেই শেষ হয় না; স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মৌলিক নিরাপত্তা না পেলে ভবিষ্যতে কাজের পরিবেশ বিপন্ন হতে পারে—এটি অনিবার্যভাবে স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
এ অবস্থায় জরুরি প্রয়োজন আছে—
- সতর্কতা ও নিরাপত্তা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন;
- রোগী-স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের যোগাযোগ ও বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য সুসংহত প্রটোকল;
- ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নিরীক্ষণ ও আহতদের চিকিত্সা ও সহায়তা নিশ্চিত করা।
আপাতত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করলেও, তাদের নিরাপত্তা ও হাসপাতালের উভয় পক্ষই এখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় আছে।