সুন্দরবন সংলগ্ন বরগুনা জেলায় ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালটি প্রায় ১২ লাখ মানুষের জন্য প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র। কিন্তু হাসপাতালটির কর্মীবাহিনী ও অবকাঠামো সমস্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ রোগীর পাশাপাশি শিশু ও মাতৃত্বসেবা প্রান্তিকতায় পড়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সরবরাহ করা তথ্য এবং রোগী প্রতিনিধি ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণে পরিষ্কার হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কার্যত সংকটাপন্ন।
মানবসম্পদে বিপুল ঘাটতি
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে দেখা যায় কাগজে-কলমে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের জন্য ৮১টি চিকিৎসকের পদের অনুমোদন আছে। তবে বাস্তবে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৭ জন চিকিৎসক। জেলা স্তরে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ২৩১, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৮ জন — এই অনুপাতে পরিষেবা দিতে যোগাযোগজনিত ও কর্মভার সমস্যা গড়ে উঠছে।
শিশু ও মাতৃত্বসেবা দুরবস্থায়
রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিশু রোগীদের জন্য বরাদ্দ ৫০টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন ভর্তি থাকে প্রায় ৪০ শিশু। শয্যা-সংকট ও ডাক্তারের ঘাটতির কারণে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা বা সিঁড়ি পাশে রাখা হচ্ছে— ফলে সংক্রমণ ঝুঁকি ও সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের শিশু কনসালটেন্ট গত ২০ দিন ধরে অনুপস্থিত থাকায় শিশুরোগী সেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
নার্সিং স্টাফের অভাব
৯৯টি নয়, রিপোর্ট অনুসারে নার্সিং স্টাফের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০৯, যেখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬৫ জন। প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১০০–১৫০ এবং বহির্বিভাগে আসা রোগীর সংখ্যা ১৫০–২০০ পর্যন্ত ওঠে। জনবল না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
দৈনন্দিন কার্যক্রমে চাপ ও রেসপন্সের বাধা
হাসপাতালের সীমিত সংখ্যক ডাক্তারদের মধ্যে অনেকেই প্রশাসনিক কাজ ও বিশেষ দায়িত্বও সামলান; ফলে বাকি রোগীদের জন্য ডাক্তার সময় পাওয়া দুষ্কর হচ্ছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কিছু চিকিৎসক সপ্তাহে মাত্র এক দিন উপস্থিত থাকেন, একজন চিকিৎসক বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন, আরেকজন ডেন্টাল ও একজন হোমিওপ্যাথি বিভাগে কর্মরত। ফলে কার্যত রোগ-চিকিৎসার মূল দায়িত্ব মাত্র ৬ থেকে ৭ জন চিকিৎসকের কাঁধে।
"রোগী বেশি, কিন্তু ডাক্তার খুব কম।"
হাসপাতালে আসা রোগীর একজন স্বজন মহিবুল (২৬) এ কথা বলেছেন। এ ধরনের অভাব রোগী-স্বজনদের মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে এবং জরুরি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে।
তথ্য সংক্ষিপ্ত টেবিলে
| বিবরণ | অনুমোদিত | বর্তমানে কর্মরত |
|---|---|---|
| জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক পদ | 231 | 78 |
| জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক পদ | 81 | 17 |
| নার্সিং পদ | 109 | 65 |
কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ?
এই জনবল ও শয্যা ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে জরুরি সেবা, শিশুরোগ ও মাতৃত্বসেবায়। বেসরকারি চিকিৎসা গ্রহণ করতে অনেকে বাধ্য হচ্ছেন, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক বোঝা বাড়ায়। রোগীর অপেক্ষা সময় বেড়ে যাওয়ায় সংক্রমণ ও জটিলতা বাড়ার আশঙ্কাও তীব্র।
এই অবস্থা সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জেলা স্বাস্থ্য দফতর কী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে—তা রোগী ও এলাকার বাসিন্দারা জানতে চান। প্রশাসনিক বদলিবিধি, পদোন্নতি বা স্থানান্তর—এসব ঘটনাই অনেক সময়ে লোকবল সংকট তৈরি করে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বলেন।
রাজস্বভিত্তিক কেন্দ্র হিসেবে এই হাসপাতালের পুনর্গঠন ও মানবসম্পদ বৃদ্ধি না হলে ভবিষ্যতে রোগী সেবার মান আরও নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ এবং স্বাস্থ্য নীতি সমন্বয় জরুরি, বিশেষ করে শিশু ও মাতৃত্বসেবা রক্ষায় তা অপরিহার্য বলে স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন।