ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রিয় ও আবন্দরী রাস্তা থেকে কাঁচিঝুলি বন্দর পর্যন্ত নানা পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসী। জরিপ ও স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা দুই-ই নির্দেশ করছে—শহরের শব্দদূষণ কেবল অমানবিক নয়, তা স্বাস্থ্যগতভাবে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
গবেষণা ও মেপে পাওয়া বাস্তবতা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুখ শহরের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা পরিমাপ করেন। তার মাপ অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন স্থানে দৈনিক গড় শব্দের মাত্রা ছিল ৭৮ থেকে ১০৬ ডেসিবেল পর্যন্ত—যা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য সীমা ৬৫ থেকে ৭৫ ডেসিবেলের অনেক উপরে।
“এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমার কাছে মনে হয় সর্বাগ্রে যেটি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে যে সচেতনতা তৈরি করা মানুষের মধ্যে। আপনি হর্ন বাজাবেন কি বাজাবেন না সেটা কিন্তু সম্পূ
এ পরিমাপ ও সহায়তা না থাকলে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হিসেবে শহরের জনঘনত্ব, যানসংখ্যার অতিরিক্ততা এবং অনিয়ন্ত্রিত হর্ন-ব্যবহারের কথা বলা যায়। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকা মিলিয়ে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে জনসংখ্যা একটানা বেড়ে ১২ লাখেরও বেশি—ফলে যাতায়াত ও জীবিকা নির্ভরতা বাড়ায় যানবাহনের চাপও বেড়েছে কয়েকগুণ।
কোথায় কতটা শব্দ পরিমাপ করা হয়েছে
| পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট | দৈনিক গড় শব্দ (ডেসিবেল) |
|---|---|
| কাঁচিঝুলি | ৭৮ - ১০৬ |
| নতুন বাজার | ৭৮ - ১০৬ |
| চরপাড়া | ৭৮ - ১০৬ |
| মাসকান্দা | ৭৮ - ১০৬ |
| পাটগুদাম | ৭৮ - ১০৬ |
| তাজমহল পয়েন্ট | ৭৮ - ১০৬ |
নগরবাসীর অভিজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব
শহরের সাধারণ মানুষ বলছেন, দিনের পর দিন অতিরিক্ত শব্দ তাদের জীবনে নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে—শ্রবণশক্তি সমস্যার পাশাপাশি ঘুমহীনতা, মাথাব্যথা, চাপ-অনিচ্ছা ও মেয়েদের মধ্যে মেজাজ কটু হওয়া ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে। এক কলেজশিক্ষিকা মেয়ের আচরণ পরিবর্তন ও মানসিক অবসাদ যে কারণে হয়েছে বলে মনে করেন।
- শ্রবণশক্তি হ্রাস: দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ শব্দে কানের তন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- মানসিক চাপ ও অনিদ্রা: নিয়মিত উচ্চ শব্দ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং স্নায়ুবিক সমস্যা বাড়ায়।
- হৃদরোগের ঝুঁকি: গবেষণামূলক নজির আছে যে উচ্চ শব্দ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
কারিগরি ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ
স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে আছে শব্দ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনকানুন; তবে বাস্তবে সেগুলো প্রয়োগের অভাব রয়েছে। অভিবাবকরা আশা করেন প্রশাসন, পুলিশ ও নগর কর্তৃপক্ষ মিলিয়ে কড়া পদক্ষেপ নেবে—যেমন অনভিপ্রেত হর্নচাপ, অসংগঠিত যানজট নিয়ন্ত্রণ ও যানবাহনের নির্ধারিত রুট পালন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন সচেতনতা সৃষ্টি সবচেয়ে কার্যকর প্রথম পদক্ষেপ। জনসাধারণ, ড্রাইভার ও ব্যবসায়ীকে এগিয়ে আসতে হবে যাতে অনাবশ্যক হর্ন-ব্যবহার ও অতিরিক্ত যানচলাচল কমানো যায়। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যদি নির্দিষ্ট ‘‘নতুন নীতি’’ গ্রহণ করে প্রয়োগ শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভবনা থাকবে।
ময়মনসিংহে বসবাসকারীদের কাছে এখন প্রয়োজন প্রশাসনিক মনোযোগ, কৌশলগত পরিকল্পনা ও অত্র জীবনের মান রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ। শব্দ দূষণ শুধুই অস্বস্তি নয়—এটি জনস্বাস্থ্যের সমস্যা, এবং দ্রুত হস্তক্ষেপ না হলে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বাড়বে।