ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাষ্ট্রায়ত্ত রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) পরিচালিত ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গ্যাস সংকটের কারণে টানা ২৬ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং বেড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
উৎপাদনপ্রতিবৃত্তে ধাক্কা
আরপিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সরবরাহ সীমিত থাকায় কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের অভাবে কেন্দ্রটি সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারছিলো—এটি প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার তুলনায় অত্যন্ত নীচু। তবে পেছনের কয়েক সপ্তাহ ধরেই সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে।
লোকাল জীবনে প্রভাব
স্থানীয়রা জানান, লোডশেডিংয়ের ফলে শহর ও গ্রামাঞ্চলে দিনের বেলায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে; কোথাও কোথাও দিনে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, ফার্মিং, খামার ও ক্ষুদ্র শিল্পকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকার কারণে গৃহস্থালীর দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হচ্ছে—রান্নাবান্না, সংরক্ষক সেবা ও চিকিৎসাসহ নানা ক্ষেত্রের কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
ইতিহাস ও গতানুগতিক প্রবণতা
১৯৯৭ সালে নির্মিত এই কেন্দ্রটি তিন ধাপে নির্মাণ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সময় সময় গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা গেছে; বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর থেকে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রটির কার্যক্ষমতা কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরের উল্লেখযোগ্য পতন—
| অর্থবছর | প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর |
|---|---|
| ২০২১-২২ | ৬৫–৭০% |
| ২০২২-২৩ | ৪৫% |
২০২৩-২৪ অর্থবছরের কিছু মাসে উৎপাদন ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যাওয়ারও তথ্য রয়েছে। এ সব চিহ্ন নির্দেশ করে যে কেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদি ন্যূনতম কার্যক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
অঞ্চলের শিল্প ও পরিবহন খাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি
শম্ভুগঞ্জ এলাকায় ছোট-বড় শিল্পকারখানা থাকায় বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহ প্রয়োজনীয়। কেন্দ্রটি দীর্ঘসময় অচল থাকলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়—ফ্যাক্টরি, হিমাগার ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুটোই অনুপস্থিত থাকায় ব্যবসা ও পরিবহন খাতে খরচ বেড়ে গিয়েছেও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কেন্দ্র ও এলাকায় দেখা সমস্যা
- গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ।
- ময়মনসিংহ বিভাগে লোডশেডিং তীব্র—দিনে বহুবার বিদ্যুৎ যায়।
- শিল্প, বাণিজ্য ও গৃহস্থালীর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আরপিসিএলের পক্ষ থেকে কেন্দ্রটির গ্যাসপাইপলাইন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত নানা চ্যালেঞ্জের কথা জানা যায়। তবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও স্থিতি সম্পর্কে কেন্দ্রের তরফে স্পষ্ট সময়সূচি এখনো পাওয়া যায়নি।
পাবলিক ও প্রশাসনিক প্রত্যাশা
স্থানীয় এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত সরবরাহ পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার মাধ্যমে কেন্দ্রটি সচল করার আহ্বান করা হচ্ছে যাতে বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক ফিরিয়ে আনা যায়।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ-জীবিকা-উৎপাদন যে ভাবে গ্যাসে নির্ভরশীল, তা প্রতীয়মান—তার ওপর স্থিতিশীলতা না থাকলে স্থানীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘপ্রশস্ত প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্র পরিচালনার মধ্যে সমন্বয় না বাড়লে আগামী দিনে ক্ষতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।