ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম নিকটে আসায় বরগুনার উপকূলীয় এলাকা আবারও ভাসছে উদ্বেগে। জেলার তালতলী, পাথরঘাটা, আমতলী, বেতাগী ও সদর উপজেলা-র নদী ও সমুদ্রসঘেঁষা জায়গাগুলোতে ছড়িয়ে পড়া বেড়িবাঁধগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন, ধস বা বিলীন হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এলাকার মানুষ বলছেন, সাময়িক বস্তা অথবা মাটি ফেলে করা সংস্কার তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না — তারা চান স্থায়ী ও টেকসই সমাধান।
স্থানীয়দের অভিমত: ক্ষতচিহ্ন নয়, স্থায়ী নির্মাণ চাই
বিভিন্ন স্থানে বেড়ির উচ্চতা কমে যাওয়া, কোনো কোনো জায়গায় সম্পূর্ণভাবে বেড়িভাগ বিলীন হয়ে যাওয়া এবং কোথাও কোথাও বাঁধ নদীর খুব কাছে চলে এসে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে—এই চিত্রই স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তারা বলছেন, প্রতিবছর দুর্যোগের আগে মোবাইল বা অস্থায়ী মেরামত করা হয়; তবে তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়।
"প্রতিবার ঝড়ের আগে বাঁধ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়... আমরা বারবার এই অস্থায়ী ব্যবস্থা চাই না। এমন বাঁধ চাই, যেটা বড় জোয়ার ও ঝড়ের চাপ সামলাতে পারবে,"— সদর উপজেলার আজগরকাঠি গ্রামের সেলিম শাহনেওয়াজ।
স্থানীয় গৃহবধূ রেহানা বেগম বলেন, তাঁদের প্রধান আতঙ্ক পানির প্রবেশ। ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি, সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। তিনি বলেন, ত্রাণে নির্ভর করে থাকার চাইতে এমন বাঁধ চাই যাতে ঘরে পানি ঢুকতে না পারে।
কৃষি ও জমির ক্ষতি: ক্ষতিপূরণের চেয়ে বাঁধ শক্ত করা জরুরি
নিশানবাড়িয়ার কৃষক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকলে ফসল নষ্ট হয় এবং জমির উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শুধু দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণ বা ত্রাণ দেওয়ার চেয়ে আগেই বাঁধ মজবুত করা বেশি জরুরি। এ আঞ্চলিক বাস্তবতা স্থানীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে।
স্থানীয়রা আরও বলেন, কেবল বাঁধের উচ্চতা বাড়ানোই যথেষ্ট হবে না; নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে—
- নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় পাড় রক্ষা ও স্লোপের মজবুতি
- প্রয়োজনীয় স্থানে ব্লক বা জিওব্যাগ ব্যবহারের পরিকল্পনা
- পানি নিষ্কাশন ও ড্রেনেজের উপযুক্ত ব্যাবস্থা
- বাঁধের নিয়মিত ও পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ
- নবীন নির্মাণে আগামী কয়েক দশকের জোয়ার ও দুর্যোগঝুঁকি বিবেচনা
স্থানীয় চাহিদা ও প্রশাসনিক জরুরি করণীয়
উপকূলবাসীর দাবি অনুযায়ী তাত্ক্ষণিকভাবে বস্তা বা মাটি ফেলা বন্ধ করে বস্তুগত, দীর্ঘমেয়াদি ও প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান নেওয়া উচিত। স্থায়ী বাঁধ তৈরির সময় নদীর গতিবিধি, স্লোপ অবস্থান, ভবিষ্যৎ জোয়ারের উচ্চতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় আনতে হবে।
| উপজেলা | প্রধান সমস্যা |
|---|---|
| তালতলী | বাঁধ ভাঙন ও অংশবিশেষ বিলীন |
| পাথরঘাটা | বাঁধ নদীর খুব কাছে চলে আসা, উচ্চতা কমে যাওয়া |
| আমতলী, বেতাগী, সদর | স্লোপ ক্ষতিগ্রস্ত, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ |
স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন—যদি এখনই দৃঢ় পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ না করা হয়, তাহলে আগামীর বড় জোয়ার বা ঝড়ে ফলিত ক্ষতি বহুগুণে বাড়বে।
দূরদর্শিতা এবং তহবিল বিভাজন জরুরি
স্থানীয়দের কথায়, সরকারের তহবিল বরাদ্দ ও প্রকল্প পরিকল্পনা কেবল একবারের জরুরি সংস্কারে সীমাবদ্ধ থেকে চলে গেলে পুনরায় একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। বারবার ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের জীবন ও আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি, পরিবেশ-বান্ধব এবং প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক বাঁধ নির্মাণ অপরিহার্য।
বরগুনার উপকূলীয় বহু পরিবার ব্যক্তি-পরিবারের জীবিকা, জমি ও বাড়ি—সবই ঝুঁকিতে। প্রশাসন, কৌশলগত পরিকল্পনাকারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় ও অংশীদারিত্ব ছাড়া টেকসই সমাধান কল্পনাও করা কঠিন। স্থানীয়রা এখন আর ক্ষণস্থায়ী ত্রাণ চাইছে না; তাদের চাওয়া একটাই—দূরদর্শী পরিকল্পনায় শক্তিশালী বাঁধ তৈরি, যাতে জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।