নাটোর জেলার সাতটি উপজেলায় মাদকের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ পাতালছাড়া। জেলা সদর, নলডাঙ্গা, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, লালপুর ও বাগাতিপাড়া—এই সব এলাকায় বাজার, বাসস্ট্যান্ড, গ্রামগঞ্জের আড্ডা ও সড়কের ধারে যেখানে চোখ রাখলেই মাদক কেনাবেচা ও সেবনের কথা শোনা যায় বলে অভিমত স্থানীয়দের।
সাম্প্রতিক অভিযানের ফলাফল
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন; অভিযানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদকজব্দ হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয়রা বলছেন সরবরাহ ব্যাবস্থা সম্পূর্ণভাবে ঠেকানো হয়নি। পুলিশের ও র্যাবের সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযান থেকে পাওয়া তথ্যগুলো নিম্নরূপ:
- ২ সেপ্টেম্বর বনবেলঘরিয়া বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকায় র্যাবের যৌথ অভিযানে ১০ কেজি ২০০ গ্রাম গাঁজাসহ দুইজন গ্রেফতার। র্যাব বলেছে গাঁজা নীলফামারী থেকে আনা হচ্ছিল এবং নাটোর হয়ে রাজশাহীর পুঠিয়া নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।
- ১০ সেপ্টেম্বর বড়াইগ্রামের মানিকপুর এলাকায় অভিযান করে ৬ কেজি গাঁজাসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়।
- ১৪ সেপ্টেম্বর লালপুর থেকে পৃথক অভিযানে ৪০০ পিচ ইয়াবা ও ১০ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিলসহ দুইজন আটক হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও বিশ্লেষণ
নাগরিক এবং অভিভাবকরা অভিযানের স্বাগত জানালেও তারা প্রশ্ন তুলছেন—যারা মাঠপর্যায়ে মাদক বিক্রি ও সেবন করছে তাদের সঙ্গে যোগ রয়েছে বড় সরবরাহকারী, পরিবহনকারী ও অর্থ সংযোগকারীদের। অনেকে মনে করেন খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীরা ধরা পড়লেও উৎস চেইন অদৃশ্য থেকে যায়।
স্থানীয়রা বিশেষ করে বলেন যে মাদক কোথা থেকে আসছে, কোথায় মজুত করা হচ্ছে এবং কিভাবে বিভিন্ন উপজেলা-এ পৌঁছানো হচ্ছে—এসব বিষয়ে সমন্বিত গোয়েন্দা তদন্ত জরুরি। তাদের আশঙ্কা, যদি প্রধান সরবরাহকারী ও অর্থসংযোগকারী গ্রেফতার না হন তাহলে অভিযানের ফল সীমিত থাকবে।
সামাজিক প্রভাব ও ঝুঁকি
মাদকবিরোধী নাগরিকরা মনে করেন যুবসমাজের মধ্যে মাদকসেবন বৃদ্ধি বিরূপ প্রভাব ফেলছে—শিক্ষা, পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক আচরণে তা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তৃত করতে পারে। কিছুমাত্র মাদক সেবনকারীদের পরিবারের কাছ থেকে টাকাও যোগান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা তাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে পারে।
তবে স্থানীয়রা একজন ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন—মাদকাসক্তের সংখ্যা বেড়ে গেলে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অনুচিত কাজেও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এই সম্ভাব্যির সত্যতা নিশ্চিত করতে কড়া তদন্ত এবং অপরাধ-তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
অভিযোগ ও প্রশাসনের দায়িত্ব
স্থানীয়রা বলছেন, নিয়মিত র্যাব ও পুলিশের অভিযান থাকা সত্ত্বেও লেনদেন ও সরবরাহস্থলে কড়া নজরদারি না থাকায় মাদক চক্র উঠে আসছে না। তারা উল্লেখ করেছেন—মাদক বিক্রেতা বা সেবনকারী আটক হলে মূল সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও অর্থ জোগানদাতাদের সনাক্ত করতে হবে।
| তারিখ | স্থান | উদ্ধারকৃত মাদক | গ্রেফতার |
|---|---|---|---|
| ০২ সেপ্টেম্বর | বনবেলঘরিয়া বাইপাস বাসস্ট্যান্ড (নাটোর সদর) | ১০ কেজি ২০০ গ্রাম গাঁজা | ২ |
| ১০ সেপ্টেম্বর | মানিকপুর (বড়াইগ্রাম) | ৬ কেজি গাঁজা | ২ |
| ১৪ সেপ্টেম্বর | লালপুর | ৪০০ পিচ ইয়াবা, ১০ বোতল ফেনসিডিল | ২ |
জেলা ও থানা পর্যায়ে অভিযানের ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিভুক্ত হলেও স্থানীয়দের দাবি—নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তঃবাহিনী সমন্বয়ের মাধ্যমে সরবরাহ চেইন কেটে না দিলে পরিস্থিতি করুণ রূপ নিতে পারে।
অবশেষে লোকাল পর্যায়ের নাগরিক সংগঠনগুলোও বলছে, যুবসমাজকে মাদকের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সমাজিক সচেতনতা কর্মসূচি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা ও অভিভাবকদেরতর দিকে কার্যকর নজর দিতে হবে। অভিযানের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কাজগুলো জোরদার করা না গেলে শুধু গ্রেফতারই সমস্যা সমাধান করবে না—এমনটাই তাদের মতামত।