নাটোর শহরের চেয়ারম্যান রোড এলাকায় গত বুধবার সন্ধ্যায় দুই শিশুর খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বিবাদ ঘিরে ঘটে এক নৃশংস ঘটনা। অভিযোগ আছে, পরবর্তী দিন বৃহস্পতিবার সকালে ওই ঘটনার জের ধরে পুলিশের একজন কনস্টেবল বায়েজিদ বিন মাহমুদ (৭)কে জোর করে বাড়িতে নিয়ে যান এবং তাঁর সহযোগী হিসেবে থাকা নাছরিন নামের তার স্ত্রী শিশুটির ডান হাতের তর্জনী আঙুল কেটে দেন।
গ্রেপ্তার ও আদালত
ঘটনায় শিশুটির বাবা মাহমুদুল হাসান নাটোর সদর থানায় মামলা করেন। মামলার পর শুক্রবার রাতে কনস্টেবল শাকিল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী নাছরিনকে ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, শাকিল নাটোর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের হিসাব শাখায় কর্মরত ছিলেন।
গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার সকালে তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
চিকিৎসা পরিস্থিতি
শিশুটিকে প্রথমে নাটোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রাজা মেডিকেল) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রাজশাহী মেডিকেলের মুখপাত্র শেখ শামীম আহমেদ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্ন আঙুল সময়মতো নিয়ে আসা না হওয়ায় তা জোড়া লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বিচ্ছিন্ন আঙুলটি আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ব্যথা
শিশুটির চিকিৎসাধীন বিছানার পাশে বিমর্ষভাবে বসে থাকা মাকে কথা বলতেই দেখা যায় না; তিনি ছেলের হাতের দিকে তাকিয়ে আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে রাখেন। আহত শিশুটির বাবা কষ্টভরে বলেন যে তাঁর ছেলে চিরতরে বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন,
“আমার ছেলেটাকে চিরতরে বিকলাঙ্গ করে দিল ভাই। আমার ছেলেটা এই হাত দিয়ে আর কোনো দিন কলম ধরতে পারবে না। এখন আসামির যদি ১০-১২ বার ফাঁসি হয়, সূর্য যদি পশ্চিম দিক থেকেও ওঠে, তবুও আমার ক্ষতিপূরণ হবে না। এই দুঃখ আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।”
ঘটনার পটভূমি ও প্রাথমিক বিবরণ
পুলিশ ও মামলার দফতরি নথি থেকে জানা যায়, একই বাসায় ভাড়া বাসিন্দারা বৃহস্পতিবার দুপুরে পারিবারিকভাবে পিকনিকের আয়োজন করায় সেখানে থাকা দুই শিশুর মধ্যে খেলাধুলার সময় মনোমালিন্য শুরু হয়। স্থানীয়রা বিষয়টি মীমাংসা করার পর পরদিন তা বাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
- আহত শিশুর নাম: বায়েজিদ বিন মাহমুদ (৭)
- অভিযুক্ত: পুলিশ কনস্টেবল শাকিল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী নাছরিন
- প্রাথমিক ব্যবস্থা: নাটোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি, পরে রাজশাহী মেডিকেলে স্থানান্তর
ঘটনার সময়রেখা
| দিন | ঘটনা |
|---|---|
| বুধবার সন্ধ্যা | চেয়ারম্যান রোড এলাকার ভাড়া বাসায় পারিবারিক পিকনিক; শিশুরা খেলাধুলায় মনোমালিন্য |
| বৃহস্পতিবার সকাল | শাকিল বায়েজিদকে ধরে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে আঙুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ |
| বৃহস্পতিবার বিকেল | আহত শিশুকে নাটোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি; পরে রাজশাহী মেডিকেলে রেফার |
| শুক্রবার রাত | শাকিল ও নাছরিনকে গ্রেপ্তার |
| শুক্রবার সকাল | আদালতে হাজির; কারাগারে পাঠানো |
আইনি প্রক্রিয়া ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
মামলা ও গ্রেপ্তারের পর এই ঘটনার বিষয়টি নাটোরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিষয়টি আইনের আওতায় গোয়েন্দা ও তদন্ত করতে জানিয়েছে। মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল ও পরবর্তী শুনানিতে কি ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
এই ঘটনার কারণে শিশু নিরাপত্তা, ভাড়া বাসা ও প্রতিবেশী সম্পর্ক, এবং পুলিশের আচরণ-আচরণবিধি নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি এখন প্রত্যাশা থাকবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের।
ঘটনাটি তদন্তাধীন। মামলার পরবর্তী বক্তব্য, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের নির্দেশনা সম্পর্কে WE NEWS রিপোর্ট করলে সংশ্লিষ্টতা অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশ করা হবে।