রাজশাহী সদরে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত লোডশেডিং মানুষের দৈনন্দিন কাজ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। নগরীর চাহিদা ও সরবরাহের সংখ্যাগত ব্যবধানে প্রতিদিনই সাড়া ফেলছে ব্যবসায়ী, কৃষক ও গৃহস্থরা। এ পরিস্থিতিতে জেলা পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জেলার ১৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য প্রশাসনের কাছে চিঠি দিয়েছেন।
সরবরাহ-চাহিদার উদাহরণগত চিত্র
নেসকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ওই দিন চাহিদা ছিল ১৩৮ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ আসছিল মাত্র ১১০ মেগাওয়াট—অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ২৮ মেগাওয়াট। অন্য সময়ে নগরীর গড় চাহিদা ১৩৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলে ১১১ মেগাওয়াট, ফলে গড় ঘাটতি দাঁড়ায় ২৪ মেগাওয়াট।
| অবস্থা | চাহিদা (মেগাওয়াট) | সরবরাহ (মেগাওয়াট) | ঘাটতি (মেগাওয়াট) |
|---|---|---|---|
| রিপোর্টের সময় (সিটি) | ১৩৮ | ১১০ | ২৮ |
| গড় (নগরী) | ১৩৫ | ১১১ | ২৪ |
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
লোডশেডিংয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের অস্থিরতা থেকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। স্থানীয়রা জানান, শহরে দিনভর প্রায় দুই থেকে চার ঘন্টা এবং গ্রামে ছয় থেকে আট ঘন্টার বেশি সময়ে বিদ্যুৎ নেই। এই পরিস্থিতি বিশেষ করে নিম্নোক্ত শ্রেণির মানুষের জন্য কষ্টদায়ক:
- বৃদ্ধ ও শিশু
- কৃষক ও ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানার শ্রমিক ও মালিক
- ছোট ব্যবসায়ী, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট প্রভৃতি
পুঠিয়ার ভড়ুয়ারপড়া এলাকায় এক চায়ের দোকানে কথা বলা স্থানীয় সাইদুর ওই কষ্ট সংক্ষেপে বলেছিলেন—
“দিনে বিদ্যুৎ না থাকলে মানা যায়। কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বিষয়টি মানা যায় না। কারণ সারাদিন কাজ কর্ম করে বাসায় এসে শান্তিতে ঘুমাতে পারি না।”
ঘন্টার ভিত্তিতে পরিবর্তনশীল সরবরাহ
প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম চৌধুরী জানান, সরবরাহের অনিয়মিততা প্রতিটি ঘন্টায় বদলাতে থাকে। কখনো চাহিদা পূর্ণ হয়, আবার কখনো লোডশেডিং করতে হয়। নগরীতে গড়ে ২০–৩০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, জেলার পাঁচ উপজেলা মিলিয়ে দিনে-রাতে মোট চাহিদা প্রায় ১১০–১১৫ মেগাওয়াট, যেখানে সরবরাহ আছে মাত্র ৮০–৮৫ মেগাওয়াট। এই অনুপাত গ্রামাঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের কষ্টের পরিচয় বহন করে।
প্রশাসন ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের করণীয়
লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা বৃদ্ধির অনুরোধ করেছে। নিরাপত্তা বাড়ানো মানে শুধুমাত্র চোরাচালান বা ভাঙচুর রোধ না; উপকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত ত্রুটি সনাক্তকরণ ও পুনরুদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যুৎ সংস্থার সমন্বয় জরুরি।
ব্যবসা ও জীবনযাত্রায় পরিণতি
লোডশেডিং বাড়লে ছোট ব্যবসা ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খণ্ডিত হয়, খাদ্যদ্রব্য পচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। গরমকালে বৈদ্যুতিক পাখা ও কুলার বন্ধ থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে; বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য গরমে অসুস্থতার সম্ভাবনা বাড়ে। সরকারের পরিকল্পনা ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনা না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা
স্থানীয়রা দ্রুত ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহসহ উপকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও নেসকোর তাত্ত্বিক তথ্য মিলে দেখায় ঝুঁকি ও ঘাটতি রয়েছে; ফলে প্রশাসনের ত্বরিত হস্তক্ষেপকে লোকজন প্রত্যাশা করছেন।
উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে রাজশাহী জেলা ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিকল্প শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ এখন সময়োপযোগী। নগর-গ্রাম উভয় এলাকায় জনগণের কষ্ট হ্রাসে তা ঠوس কার্যক্রম ছাড়া সম্ভব নয়।