গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল সাম্প্রতিককালে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট-এর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে। গ্যাস চাপ না থাকায় এবং বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ও কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় শিল্প ও শ্রমিকরা বলছেন, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বাড়বে।
ক্ষতির পরিসর ও প্রভাব
গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর তথ্য অনুযায়ী জেলার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানায় গ্যাসের চাপজনিত কারণে উৎপাদন কমেছে। জেলায় মোট প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় শিল্পকারখানা রয়েছে এবং আনুমানিক ৪০০ থেকে ৪৫০টি কারখানায় সরাসরি গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। প্রভাবিত কারখানাগুলোতে উৎপাদন কিছু স্থানে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
কী ধরণের শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
- টেক্সটাইল ও গ্রেডিং—বয়ান, ডাইং ও প্রসেসিং ইউনিটে গ্যাসচাপের অভাব সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতা তৈরি করছে।
- ফ্যাশন ও পোশাক উৎপাদন—ডাইং সেকশনে চাপ কম থাকায় উৎপাদন বন্ধ রাখা বা অপেক্ষার অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।
- ছোট-খাটো কারখানা—বিকল্প সুবিধা না থাকায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।
কোনাবাড়ীর ফুয়াদ স্পিনিং মিলস লিমিটেড এই সংকটের সরাসরি শিকার। সংস্থাটি সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে গ্যাসের চাপ না থাকায় তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল এবং আর্থিক চাপের মুখে ১ আগস্ট থেকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত প্রায় ৫শতাধিক শ্রমিক কার্যত কর্মহীন অবস্থায় পড়েছেন।
"কয়েক মাস ধরেই গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল।"
এই মন্তব্যটি প্রতিষ্ঠানটির ডিজিএম আজিজুল হক করেছে, যে সংকট না মিটলে আবার কারখানা চালু করা কঠিন হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। কালিয়াকৈরের সাদমা ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেছেন, ডাইং সেকশনে চাপ না থাকায় শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে অপেক্ষা করতে হচ্ছে—কখনো চাপ ফিরলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের এজিএম রবিউল ইসলামও গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন।
পুলিশ ও সরবরাহ সংস্থার অবস্থান
গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। তিনি জানান, গ্যাস চাপ কমে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন কারখানায় কাজ কমে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কারখানা বন্ধের নোটিশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।
তিতাসের জরুরি বিভাগের একজন কর্মকর্তা সুশান্ত জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের থেকে বিভিন্ন এলাকার গ্যাস লাইনের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ অনবরত আসছে এবং অভিযোগ পেয়ে তারা নথিভুক্ত করছেন।
স্থানীয় সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ (প্রয়োগযোগ্য কিছু দিক)
- সরবরাহ কর্তৃপক্ষকে দ্রুত অবস্থা বিশ্লেষণ করে শিল্পভিত্তিক অগ্রাধিকার ভিত্তিক গ্যাস দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
- শ্রমিকদের স্বল্পমেয়াদী আর্থিক সহায়তা ও কল্যাণ তহবিল গঠনের অফার টেকসই ক্ষতি সীমিত করতে সহায়ক হবে।
- সম্ভব হলে বিকল্প জ্বালানি বা ক্ষমতাসঞ্চালন ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন পুনরায় শুরু করার উপায় খুঁজতে হবে।
| দিক | অবস্থা |
|---|---|
| মোট শিল্পকারখানা | প্রায় ৩,০০০+ |
| সংকটগ্রস্ত কারখানা (অনুমান) | ৪০০–৪৫০ |
| অর্থযোগ্য উৎপাদন ক্ষতি | কিছু ক্ষেত্রে ~৪০% |
শ্রমিক ও মালিক উভয়পক্ষই অস্থির। শ্রমিকেরা বলছেন, কাজ না থাকলে তাদের পরিবার-জীবিকা অচল হয়ে পড়বে এবং মালিকেরা অভিযোগ করছেন যে উৎপাদন না থাকলে বেতন-ভাতা জারি রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক কারখানা দীর্ঘকাল যদি বন্ধ থাকে তাহলে কর্মসংস্থান সংকট প্রকট হবে—এমনটাই আশঙ্কা শিল্পখাতে সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয় প্রশাসন, শিল্প সংগঠন ও সরবরাহ কর্তৃপক্ষের তৎপরতা ও সমন্বয় না হলে সংকট আরও তীব্র রূপ নেবে—এই আশঙ্কা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক পর্যায়ের বিবৃতিতে উঠে এসেছে। জেলা শিল্প অঞ্চলের অচল অবস্থা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে।
গাজীপুর থেকে রিপোর্ট করেছেন শাহনাজ পারভীন, গাজীপুর প্রতিনিধি, WE NEWS।