সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দীর্ঘদিন ধরে আগের ঢঙে কর্মচাঞ্চল্য ছবি আর নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী, হ্যান্ডলিং শ্রমিক ও সি অ্যান্ড এফ এজেন্টরা সবাই একই করুণতাকেই দেখছেন—পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল কমেছে, খালাস ও পরিবহনে ঘাঁটা পড়েছে এবং ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে।
খুব সরাসরি প্রভাব: শ্রমিক থেকে রাজস্ব
স্থানীয়ভাবে বন্দরের পাশের হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেকেই টিকতে পারছেন না। কাজ না পেয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন বলে শ্রমিক আজিজুল ইসলাম জানান। তিনি বলেন, “এখন কাজের অবস্থা খুবই খারাপ। তার ওপর মজুরিও কম। সংসার চলে না। অনেক শ্রমিক কাজের খোঁজে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন। আগে যেভাবে আমদানি-রপ্তানি হতো, এখন আর তা হয় না।”
সি অ্যান্ড এফ এজেন্টদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা বলেন, এক পর্যায়ে বন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছিল এবং এতে অনেক কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, ভোমরা বন্দরে সব ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে অনেক পণ্য এই বন্দরের মাধ্যমে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজস্ব লক্ষ্য ও আদায়: বড় ব্যবধান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ভোমরা বন্দরের জন্য ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রেখেছে। জুলাইয়ে আদায় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। বর্তমান ধারা বজায় থাকলে বছরের শেষে লক্ষ্যের অর্ধেকও পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে দিয়েছেন।
গত অর্থবছরে এ বন্দর কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা—ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৯৫১ কোটি টাকা।
| আর্থিক বছর | আমদানি (টন) | রপ্তানি (টন) | আয় (কোটি টাকা) |
|---|---|---|---|
| ২০২৪–২৫ | ২০,৮২,৭২২ | ২৮,০৬,০০০ (সূত্রে পূর্ণ সংখ্যা নয়) | ৩,৪০৬ কোটি ৯৫ লাখ (রপ্তানি আয়) |
| ২০২৫–২৬ | ১৯,৭৩,০৪৭ | ১৭,৮০,০৯৯ | ১,৮৯২ কোটি (রপ্তানি আয়) |
পরিসংখ্যানের ভাষা
কাস্টম হাউসের প্রদত্ত তথ্যে দেখা যায়, এক বছরে ভোমরা দিয়ে আমদানি কমেছে ১,০৯,৬৭৫ টন। রপ্তানির পতন আরও বেশি তীব্র; ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫–২৬ সালে রপ্তানি টনেজ ও আয়—দুটোই বড় হারে হ্রাস পেয়েছে। ফলে স্থানীয় বাণিজ্য ও চাকরির ওপর প্রভাব পড়ে।
কারণ ও সীমাবদ্ধতা
সি অ্যান্ড এফ নেতারা ও ব্যবসায়ীরা মূলত দু’টি কারণে এই পতনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন:
- প্রতিদিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের নিজস্ব হ্রাস—ট্রাক চলাচল কমা, খালাস বিলম্ব ও কাজের ধীরগতি;
- ভৌত অবকাঠামো ও সুযোগসুবিধার সীমাবদ্ধতা—কিছু ধরণের পণ্য পরিবহনে উপযোগী সুবিধার অভাব থাকায় সেই পণ্য অন্য বন্দরের মাধ্যমে আসছে।
লোকাল অর্থনীতি ও পরবর্তী সংকট
স্থানীয়ভাবে এর প্রভাব স্পষ্ট: হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের দৈনন্দিন আয় কমছে, সি অ্যান্ড এফ অফিস ও পরিবহনে যুক্ত কর্মীরা কর্মহীনতার মুখে পড়ছেন। বৃহত্তর অর্থনীতিতে এ ধরনের ধারাবাহিক পতন হলে রাজস্ব স্বল্পতা জাতীয় খাতে পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে—রাষ্ট্রীয় আয় কমলে উন্নয়ন খাতে প্রভাব পড়তে বাধ্য।
উদ্যোগ কোথায় প্রয়োজন
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভোমরার সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন, মালামাল হ্যান্ডলিং দ্রুততর করার জন্য প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্ত পারাপারে সুষ্ঠু লজিস্টিক সমন্বয় ফিরিয়ে আনলেই ট্রাফিক ও রাজস্ব উভয়েই বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোমরা বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত; বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দ্রুত প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা প্রয়োজন।