ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার একটি ঘটনায় নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের মামলায় তিন জনকে জাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায় মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে ফরিদপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের আদালতে ঘোষণা করেন জেলা ও দায়রা জজ ও ট্রাইব্যুনাল পরিচালনাকারী বিচারক মো. আবুল বাশার মিঞা।
রায় ও অভিযুক্তদের পরিচয়
আদালত রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনের নাম ও পরিচয় এ রকম:
| নাম | বয়স | ঠিকানা |
|---|---|---|
| নাসির মোল্যা | ২৬ | মাগুরা, মোহাম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী গ্রাম |
| সৈকত চন্দ্র | ২৬ | ফরিদপুর, বোয়ালমারী উপজেলার লঙ্কারচর এলাকা |
| নাসির মোল্যা | ৩৬ | ফরিদপুর, বোয়ালমারী উপজেলার একই গ্রামের বাসিন্দা |
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
এজাহার ও তদন্তের পর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী স্থানীয় গোহাইলবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। ঘটনার সূত্রপাত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ১ নম্বর আসামি নাসির মোল্যার সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ায়।
২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ৮টায় আসামি নাসির মোল্যা দেখা করার জন্য ছাত্রীটির বাড়ির কাছাকাছি জীবন মন্ডলের বাগানের কাছে আসে। সেখানে পৌঁছালে আগে থেকে ওৎ পেত রাখা অন্যান্য আসামিরা তাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। পরে মধুমতী নদীর তীরে থাকা একটি নৌকায় তুলে চরে নিয়ে গিয়ে তারা পালাক্রমে তাকে গণধর্ষণ করে। ঘটনার সময় অভিযুক্তরা ওই নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি তোলার মাধ্যমে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
ধারণা, অভিযোগ ও মামলা
ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত প্রায় ১১টায় আসামিরা তাকে আবার নৌকায় করে নদীর পাড়ে ফিরিয়ে এনে বাড়ির কাছে ফেলে পালিয়ে যায়। অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে সে পরিবারকে বিষয়টি বলেন। পরিবারের সিদ্ধান্তে পরবর্তী দিন ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি বোয়ালমারী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
- মামলাটি তদন্ত ও আদালতে পর্যায়ক্রমে প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
- আদালত প্রত্যেক আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
জানানো হয়েছিল, "এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ফলে সমাজে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।"
ফরিদপুর শিশু সহিংসতা দমন ও ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. আবুল বাশার মিঞা রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে এই মন্তব্য করেন এবং রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্থানীয় প্রভাব ও পরবর্তী ব্যবস্থা
বোয়ালমারী এলাকায় ওই ঘটনায় পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় স্কুল-সামাজিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয় ছিল। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি উঠে আসছিল। এই রায় এলাকার মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে— কারো মতে এটি ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, আবার কারো মতে উপযুক্ত শাস্তি পরিপূর্ণভাবে বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের সক্রিয়তার প্রতিফলন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্তরা উপস্থিত ছিলেন এবং পরে প্রক্রিয়াগতভাবে তাদের জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার মামলার গ্রহন, তদন্ত ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানানো হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে শিশুসুরক্ষা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান রয়েছে।
ফরিদপুরে শিশুসুরক্ষা ও নারী নিরাপত্তার বিষয়টি দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক রায় যদি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয়, তাহলে স্থানীয় সমাজে অপরাধহ্রাস ও মানুষের বিশ্বাস বৃদ্ধিতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে—তবে তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে হবে কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং গৃহীত রায়ের যথাযথ বাস্তবায়ন।
রিপোর্ট: বিপ্লব সরকার, ফরিদপুর প্রতিনিধি, WE NEWS