ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি সংঘটিত এক স্কুলছাত্রী ধর্ষণ মামলায় আজ আদালত তিনজনকে জাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ এসেছে। রায় ঘোষণা করেছেন ফরিদপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, জেলা ও দায়রা জজ মো. আবুল বাশার মিঞা।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও মামলা
আশ্রিত সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই ছেলে নয়—নবম শ্রেণির একটি স্থানীয় স্কুলের ছাত্রীরা। আসামি নম্বর ১ নাসির মোল্যার সঙ্গে মুঠোফোনে পরিচয় হওয়া, তারই সূত্র ধরে ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাত প্রায় ৮টায় নাসির ছাত্রীকে দেখা করার জন্য বাড়ির কাছাকাছি জীবন মন্ডলের বাগানে ডেকে আনে। অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রী সেখানে গেলে তিন আসামি জোরপূর্বক তাকে ধরে নেয় এবং পরবর্তীতে মধুমতি নদীর তীরে থাকা একটি নৌকায় তুলে চরে নেয়। সেখানে পালাক্রমে তাকে ভয়ভীতির মধ্যে রেখে গণধর্ষণ করা হয় এবং মোবাইলে সেই নৃশংস ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করে।
ঘটনাস্থল থেকে রাতে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে ভুক্তভোগী ঘটনাটি পরিবারের সদস্যদের জানালে, পরিবারের পক্ষ থেকে ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি বোয়ালমারী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে অভিযোগ দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন।
আসামিদের পরিচয় ও শাস্তির বিবরণ
| নাম | ঠিকানা/উপজেলা | বয়স | শাস্তি |
|---|---|---|---|
| নাসির মোল্যা | মাগুরা, মোহাম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী গ্রাম | ২৬ | জাবজ্জীবন সশ্রম, ১ লাখ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে ১ বছর) |
| সৈকত চন্দ্র | বোয়ালমারী — লঙ্কারচর | ২৬ | জাবজ্জীবন সশ্রম, ১ লাখ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে ১ বছর) |
| নাসির মোল্যা (আরও এক ব্যাক্তি নামইতেছে) | বোয়ালমারী — একই গ্রামের | ৩৬ | জাবজ্জীবন সশ্রম, ১ লাখ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে ১ বছর) |
পিটিশন, বিচার ও প্রতিক্রিয়া
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে পুলিশ প্রহরায় তাদের ফরিদপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার রাষ্ট্র পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রচিতকারকতায় ছিলেন ফরিদপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া রতন। তিনি রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন—
“আমরা এ রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ফলে সমাজে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে এবং অপরাধীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হবে।”
ট্রাইব্যুনালের রায় স্থানীয় সমাজে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। বাস্তবিকই ন্যায়বিচারের সিদ্ধান্ত শিশুশত্রু অপরাধ প্রতিহত ও সকলের নিরাপত্তা জোরদার করার একটি বার্তা বহন করে, তবে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সমাজের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—কি করে এক তরুণী এত বড় বিপদে পড়লেন ও সে সময়ে স্থানীয়দের তৎপরতা কোথায় ছিল।
- ঘটনার দিন: ২৮ জানুয়ারি ২০২০ রাত প্রায় ৮টা–১১টা পর্যন্ত।
- মামলা দায়ের: ২৯ জানুয়ারি ২০২০, বোয়ালমারী থানা
- রায়: ১৮ আগস্ট ২০২৬, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল
এ রায় স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নজরদারির প্রশ্নও তুলেছে। এমন ঘটনা প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্থানীয় নেতাদের সচেতনতা বাড়ানো এবং দ্রুত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অপরদিকে, পর্নোগ্রাফিক ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা ছড়ানো হলে ভুক্তভোগীর লজ্জা দ্বিগুণ হয়—এই দিকটিও আইনী ও সামাজিকভাবে মোকাবিলার দাবি রাখে।
এ মামলায় অভিযোগ, তদন্ত-বাস্তবতা এবং রায়ের বিবরণ নিয়েই স্থানীয় আদালত ও পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার কঠোরতায় ও আইনের প্রয়োগে যে সিদ্ধান্ত এসেছে তা ফরিদপুরে এমন জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে বলে অনেকে মনে করছেন।
ফরিদপুর থেকে রিপোর্টিং করা এই ঘটনার স্থানীয় প্রভাব ও সমাজগত প্রেক্ষাপট নিয়ে আরও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।