ফরিদপুরে বিদেশে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে প্রতারণা করে টাকা নেওয়ার পর মুক্তিপণ দাবি করে একজনকে অপহরণ এবং প্রায় নয় দিন শিকলবন্দি করে রাখার ঘটনায় র্যাব-১০ একটি অপহরণকারী চক্রের মূলহোতাসহ তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। অভিযানে জীবিত উদ্ধার করা হয় ভিকটিম মো. নিলয় শিকদার (৩৫)-কে।
ঘটনার সারসংক্ষেপ
র্যাব-১০ মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ৬ আগস্ট নিলয়কে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা প্রথমে পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা না দেয়ার ক্ষেত্রে হত্যার হুমকিও দেয়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে মোট ৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পাঠালেও বাধ্য করে মুক্তি দেওয়া হয়নি এবং পরবর্তীতে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
“অপহরণকারী চক্রের মূলহোতাসহ তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১০।”
র্যাব জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে নিলয়ের কাছ থেকে বিদেশে কাজ দেওয়ার নামে কয়েক দফায় মোট ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে বিদেশে না পাঠিয়ে অপহরণ করা হয়। অপহরণের পর নিলয়কে একটি কক্ষে আটকে রেখে পায়ে শিকল পরিয়ে গ্রিলের সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তাকে মারধর করা হয় এবং দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হতো। নির্যাতনের সময় বাইরে কানে শব্দ পৌঁছাতে না পারে সেজন্য উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্স চালানো হত—এই তথ্যও প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে।
র্যাব অভিযানের বিবরণ ও গ্রেফতার
মামলা অনুসন্ধান ও তদন্তের ধারাবাহিকতায় র্যাব-১০ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায়। ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তার অধিযাচন পত্রের ভিত্তিতে গত ১৫ আগস্ট রাত ১১টা ৫০ মিনিটে ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুর এলাকার একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে পায়ে শিকল ও তালা লাগানো অবস্থায় নিলয়কে উদ্ধার করা হয়। এ সময় চক্রের মূলহোতা মো. ফেরদৌস উর রহমান (৪২) এবং মহুয়া আহমেদ (৩২)কে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী দিন ভোরে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানাধীন মুন্সীডাঙ্গী এলাকার নিজ বাড়ি থেকে এসএম মনোয়ার (৩৬)-কে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, অভিযানে গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে, যা মামলার তদন্তে সহায়ক হবে।
| উদ্ধারকৃত জিনিস | সংখ্যা / বিবরণ |
|---|---|
| লোহার শিকল | ২টি |
| তালা ও চাবি | ২টি |
| স্টিলের পাইপ | ২টি |
| চাকু | ১টি |
| মোবাইল ফোন | ৬টি |
| নগদ টাকা | কিছু পরিমাণ |
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও র্যাবের পরামর্শ
এই কাণ্ড তথ্যপ্রসূতভাবে মানবপাচার ও প্রতারণামূলক কর্মপ্রকরণ সম্পর্কিত আশঙ্কাকে তীব্র করেছে। র্যাব-১০ উল্লেখ করেছে যে, যখন কেউ বিদেশে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখায় তখন দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তারা স্থানীয়দের সতর্ক করে বলেন, বৈধ ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছাড়া বিদেশ যাত্রা ঠিকভাবে সম্পন্ন করা উচিত নয়।
- র্যাব স্থানীয়দের নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা র্যাবকে তথ্য দিতে অনুরোধ করেছে।
- যারা বিদেশে চাকরির সুযোগ নিচ্ছেন তাদেরকে যাচাই-বাছাই ও দলিল যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
- উচ্চমূল্যের লেনদেন বা অচেনা নম্বরে অর্থ প্রদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘটনার দায়েরকৃত মামলা, গ্রেফতার ও উদ্ধারের আলামতগুলো থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও তদন্ত চলমান আছে—র্যাব-১০ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফরিদপুরের স্থানীয় মানুষ ও পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে ভিকটিমের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা ও ঘটনার ব্যপারে দ্রুত বিচার চাচ্ছেন।
এই ঘটনার আলোকে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতা ও অনলাইনে বা মোবাইল প্ল্যাটফর্মে আর্থিক লেনদেনে সতর্কতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। ফরিদপুরে এমন ধরনের প্রতারণা ও অপহরণ-প্রচেষ্টা রোধে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ কেমন হবে—তাও স্থানীয়দের নজরকাড়ছে।
রিপোর্টার: ফরিদপুর প্রতিবেদক, WE NEWS