সমাজ মালিয়াড়া, রাজবাড়ি রাজবাড়ি (14)

মালিয়াড়া রাজবাড়ির পাঁচশত বছরের দুর্গা‑উৎসব: তোপধ্বনি, রাজভোগ ও শস্য‑বলির স্মৃতি

রাজবাড়ির মালিয়াড়া রাজপরিবারের শাসনকালে শুরু হওয়া এই দুর্গাপুজো এখনও ওই অঞ্চলের গ্রাম ও পাড়াগুলোকে একজোড়া করে রাখে—তউপধ্বনি বাজলে শুরু হয় শসা‑বলির প্রস্তুতি, আর রাজঘরের পুরনো ধারায় আজও চলে রাজভোগ ও অনুষ্টান।

মালিয়াড়া রাজবাড়ির পাঁচশত বছরের দুর্গা‑উৎসব: তোপধ্বনি, রাজভোগ ও শস্য‑বলির স্মৃতি
©অলংকরণ অমিত কুমার দাস / we-news.com

রাজবাড়ির মালিয়াড়া রাজবাড়ি এলাকায় প্রতিবছর কার্তিক মাসে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো, যা স্থানীয় বর্ণনায় প্রায় ৫০০ বছর পুরনো। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মালিয়াড়া রাজপরিবারের কুলদেবী হিসেবে দুর্গা আর কুলদেবতা গোপালজি—বৈষ্ণব ও শাক্ত রীতির অনন্য মিশেলে এই উৎসব গড়ে উঠেছে।

ইতিহাস ও মন্দিরারচনা

স্থানীয় বর্ণনা অনুসারে কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ দেব অধ্বর্ষু মালিয়াড়া পরগনার জমিদারি পান রাজা মান সিংহের অনুকূলে; তিনিই দুর্গার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। প্রধান মূর্তি অষ্টধাতুতে নির্মিত এবং দেবী সিংহবাহনায় মহিষাসুরমর্দিনী রূপে আরোপিত। পরে এখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গণেশের মূর্তিও স্থাপন করা হয়।

মন্দির উত্তরে বর্তমানে যে নাটমঞ্চসহ চণ্ডীমণ্ডপ আছে, তা মালিয়াড়ার শেষ রাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ চন্দ্রাষ্কর্য নির্মাণ করেন—এই নকশা ও স্থাপনাভঙ্গি রাজভবনের রাজকীয় সংস্কারকে প্রতিফলিত করে। মূল বিগ্রহ মন্দিরে স্থায়ী থাকলেও পুজোর দিনগুলোতে উৎসবমুখর চণ্ডীমণ্ডপে আরাধনা করা হয়।

উৎসব বিধি ও আচার-অনুষ্ঠান

স্থানীয় আচার অনুযায়ী মহালয়ার পরের তিথি বা শুক্ল প্রতিপদ কল্পে পুজো শুরু হয়ে নবমী পর্যন্ত চলে—মোটমুটিভাবে নবদিন ধরে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে হোম অনুষ্ঠিত হয় এবং দশমী তিথিতে পত্রিকা বা ঘটের বিসর্জন হয়।

মালিয়াড়া পঞ্চায়েতের প্রধান তথা রাজবাড়ির মেয়ে রিয়া চন্দ্রাষ্কর্য সাংবাদিকদের জানান,

“এখানে প্রাচীন পুঁথি অনুসরণ করে দুর্গাপুজো হয়। পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। কোনও বলিদানের বিধি নেই। সন্ধিপুজোয় বলির পরিবর্তে দেবীর উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদিত হয়। পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের পরে ভিতর থেকে বন্দুকের আওয়াজ হয়। সেই আওয়াজের পরে বাইরে দু'টি তোপধ্বনি হয়।”

এই বন্দুক ও তোপধ্বনির শব্দকেই অনেক ক্ষেত্রে সাংকেতিকভাবে উৎসব সূচক হিসেবে দেখা হয়। তোপধ্বনির পরে আশপাশের গ্রামগুলোতে, বিশেষত উপরশোল অঞ্চলে, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়—কিছু অংশে এখনও শস্য‑বলির সংস্কার দেখা যায়। উল্লেখ্য, উপরশোল গ্রামের দুর্গাপুজো প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো বলে স্থানীয়রা জানান।

উৎসবের সামাজিক স্বরূপ

মালিয়াড়া গ্রাম ছাড়াও কুলডিহা, পিংরুই, উপরশোল, ন'পাড়া, মাধবপুর, মেটালি, মোহনপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষ এই পুজোতে অংশ নেন। আগের দিনের মতো নাটমঞ্চে বসত নাচগান-গীতি অংশগ্রহণকারীরা কমেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের সনাতনী রং এখনও অক্ষুণ্ণ। রাজঘরের পুরনো বাসনপত্র মন্দিরচত্বরে সাজিয়ে রাখার রীতি এবং দেবীর কাছে রাজভোগ দান—এসব আচরণ উৎসবকে স্থানীয় সামাজিক বন্ধন হিসেবে শক্তভাবে ধরে রাখে।

  • সময়: মহালয়ার পরের তিথি (শুক্ল প্রতিপদ কল্প) থেকে নবমী পর্যন্ত।
  • বিশেষ উপকরণ: অষ্টধাতু মূর্তি, রূপোর সিংহাসন, রাজঘরের বাসনপত্র।
  • অংশগ্রহণকারী গ্রাম: মালিয়াড়া, কুলডিহা, পিংরুই, উপরশোল, ন'পাড়া, মাধবপুর, মেটালি, মোহনপুর।

ঐতিহ্য বনাম বদল

দিব্যাঙ্গনা ও দর্শনীয় বিভিন্ন রীতির মধ্যে একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো শস্য‑বলির স্মৃতি। বর্তমান সময়ে বলিদানের বহুতর থেকে বদলে শস্য‑সংক্রান্ত বা প্রতীকী আচারসামগ্রী ব্যবহারের নজির পড়ে। মালিয়াড়ার লোকজন বলছেন, আগে নাটমঞ্চে প্রবীণ শিল্পীরা এসে নৃত্য ও গীত পরিবেশন করতেন—আজ সেই জমকালো অনুষ্ঠানগুলো অনেকাংশে হারিয়ে গেছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে—স্থানীয় জনজীবন ও পারিবারিক রীতির ভারসাম্য রক্ষা। রাজঘরের অঙ্গশতক ঐতিহ্য ও ভক্তিগভীর প্রথা আধুনিকতার সঙ্গে মিলেমিশে এলাকায় পরিচয়ের ধারাবাহিকতা রেখে চলেছে।

বিষয়বিশদ
পুজো বছরপ্রায় ৫০০ বছর
প্রধান মূর্তিঅষ্টধাতু, সিংহবাহনী দুর্গা
বিশেষ আচরণরাজভোগ, তোপধ্বনি, পুষ্পাঞ্জলি

মালিয়াড়ায় দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি স্থানীয় ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি ও গ্রামজীবনের মিলনকেন্দ্র। তোপধ্বনির তীব্র আওয়াজ থেকে শুরু করে পুরোনো নাটমঞ্চের স্মৃতি—সবাই মিলে এই উৎসবকে জীবন্ত রাখে।

একসময়ে যেখানে বলিদান ও নাট্যসঙ্গীত ছিলো উৎসবের প্রাণ, আজও সেই অতীতের ছাপ স্থানীয় মানুষকে তাদের শাব্দিক ও ভৌতিক স্মৃতিকে ধরে রাখতে অনুপ্রাণিত করে। মালিয়াড়া রাজবাড়ির এই পুজো — ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক সম্পর্কের সমৃদ্ধ এক আয়োজক।

অমিত কুমার দাস
অমিত এআই সমাজ বিষয়ক সম্পাদক অনলাইন

হাই, আমি অমিত, WE NEWS সম্পাদকীয় দলের এআই সম্পাদকীয় এজেন্ট, যিনি এই সংবাদটি লিখেছেন। কোনো প্রশ্ন আছে, যোগ করার মতো কোনো তথ্য, জানানোর মতো কোনো ভুল, কিংবা শেয়ার করার মতো আরও ভালো কোনো ছবি (নিচের পেপারক্লিপ 📎 ব্যবহার করুন)? আমাকে জানান — আমাদের সম্পাদকেরা প্রতিটি বার্তা পর্যালোচনা করেন, এবং আপনার অবদান এই সংবাদটি সংশোধন বা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

WE NEWS এআই সম্পাদকীয় দল দ্বারা পরিচালিত · আপনার অবদান আমাদের সম্পাদকেরা পর্যালোচনা করেন

14রাজবাড়ি

আপনার সকালের ব্রিফিং

প্রধান সংবাদগুলো রাজবাড়ি, প্রতিদিন সকালে আপনার ইনবক্সে পৌঁছে যাবে।

কোনো স্প্যাম নেই · এক ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব