নিমতিতা রাজবাড়ি—বহু দশকের স্মৃতি জমেছে এখানে। বাইরের ভাঙাচোরা মুখ দেখে হয়ত বোঝা যাবে না, কিন্তু প্রাসাদের ভেতর ঢুকলেই সময় যেন থমকে আছে। উৎসের বর্ণনায়, প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ওই রাজবাড়ি ১৮৫৫ সালে ইতালিয়ান আভিজাত্যপূর্ণ স্থাপত্যে গড়ে ওঠে; সেখানে ছিল একবার আধুনিক বিবেচনায় ১৫০টি ঘরের প্রাসাদ।
পুজোর পুরনো রীতি, সমসাময়িক দর্শন
নিমতিতার দুর্গাপুজোকে স্থানীয়রা বলছেন জেলার একসময়ের বৃহৎ পুজোর অস্তিত্বের সন্ধান। কথিত ছিল একসময় ১০১ জন ঢাকি একসঙ্গে ঢাক বাজাতেন এবং পাঁচ দিনের পদ্ধতিতে হাজার হাজার মানুষ এখানে ভিড় করত। জমিদার পরিবারের ভাণ্ডার থেকে খাবার জোগানো হতো গরুর গাড়িতে করে—এগুলো ছিল রাজকীয় আয়োজন।
সময়ের সঙ্গে জমিদারি কাঠামো বিলীন হলেও, পুজোর রীতিগুলি—যা বহু প্রজন্ম ধরে চলেছে—এখনো অটুট। উৎস বলে, প্রায় ৩৫০ বছর ধরে চলা এই একচালার (একজন প্রতিমা-নির্মাতা) প্রথা আজও বজায় আছে; একই কুমোর পরিবার প্রজন্ম অনন্তর প্রতিমা গড়ে দিচ্ছে এবং পুরোহিতরাও সেই পারিবারিক ধারা অনুসরণ করছেন।
চলচ্চিত্র ও স্মৃতি—রাজবাড়ির আরেক পরিচয়
নিমতিতা রাজবাড়ি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্যও আলাদা আকর্ষণ। উৎসে উল্লেখ আছে, এই বাড়িই সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর—আর এখানেই রেকর্ড করা হয়েছিল “দেবী” ছবির কিছু শট, পাশাপাশি অপর্ণা সেনের “সমাপ্তি”র একটি সিঁড়ি দৃশ্যও ঐ উঠোনেই রেকর্ড করা হয়েছিল। তাই পুজোর সময় এখানে আসা মানুষরা দুই কারণে আকৃষ্ট হন—একজন ভারতের সামাজিক-ধর্মীয় উৎসব দেখার জন্য, আরেকজন সত্যজিত-নস্টালজিয়ার ছোঁয়া পাওয়ার জন্য।
সূত্রে বলা আছে, পঞ্চমীর ভোরে দেবীকে ‘থানে’ তোলা হলে বিশেষ অনুভূতি জাগে—মাঠের এক কোণে থাকা পুরোনো ঝাড়লণ্ঠনটা যেন ছবির ওই ঐতিহ্যবাহী মুহূর্তগুলোর সাক্ষী।
“শরীর খারাপ থাকলেও ভিডিও কলে মায়ের মুখ না দেখলে পুজো অসম্পূর্ণ লাগে। এই দুর্গা আমাদের কাছে জাগ্রত।”
এই মন্তব্যটি করেছেন চৌধুরী পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের মধুছন্দা চৌধুরী। তিনি আরও জানান, পরিবারে বৈষ্ণব ধর্মানুসারে পুজোর ভোগে লবণ ব্যৱহৃত হয় না; মায়ের ভোগ থাকে লুচি, পাঁচ রকম ভাজা, পায়েস ও মিষ্টি—সবই নুন ছাড়া।
পুজোর আয়োজন ও ধরণ
পুজোর ধারাবাহিকতা এবং বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে উৎসে যেসব তথ্য আছে, সেগুলো সংক্ষেপে:
- ষষ্ঠী: বোধন
- সপ্তমী: সকালে বাঁশি বাজিয়ে আরতি
- অষ্টমী: সন্ধিপুজোর সময় সারাজীবন নিভিয়ে শুধু প্রদীপ জ্বলে
- নবমী: ধুনো পোড়ানোর প্রথা
- দশমী: পদ্মার ঘাটে বিসর্জন
এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে অনেকেই একবছর অপেক্ষার পর পুনরায় মায়ের দর্শন পান। অনেকে কলকাতা থেকেও আসে, আর যারা আসতে পারেন না তারা ভিডিও কলে অঞ্জলি দেন।
হেরিটেজ নামকরণ ও বাস্তবতা
২০২২ সালে নিমতিতা রাজবাড়িকে হেরিটেজ তকমা দেওয়া হয়—কিন্তু উৎসে বলা আছে, সেই পরিচয় পেলেও কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। ইট খসে পড়া, দেয়ালে ফাটল, ঝাড়লণ্ঠনেই ধুলো—এই দৃশ্য বর্তমান। সংস্কারের অভাবে ভবনের স্থিতি অনিশ্চিত মনে করছেন স্থানীয়রা ও পঠিত ট্র্যাভেলাররা।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নেম | নিমতিতা রাজবাড়ি |
| নির্মাণকাল | ১৮৫৫ |
| জমির পরিমাণ | প্রায় ১০ বিঘা |
| ঘরের সংখ্যা (বর্ণিত) | ১৫০ |
| হেরিটেজ | প্রাপ্ত (২০২২) |
সংরক্ষণ না হওয়া পর্যন্ত এই নান্দনিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানের প্রাসাদিক চেহারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এটা স্থানীয়দের উদ্বেগ। তবে পুজোর সময় রাজবাড়ির উঠোনে ভিড় ও রীতিনীতির ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, এখানে ঐতিহ্য আজও প্রাণিত।
নিমতিতা রাজবাড়ির এই দিকটি—প্রাচীন রীতি, চলচ্চিত্রের স্মৃতি ও হেরিটেজ চিহ্নিত হওয়া—সবই মিলিয়ে এক জাতীয়, নান্দনিক স্মৃতিসৌধ। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে যদি সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজ সঙ্গতভাবে শুরু হয়, তা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই স্থানের আর্থ-সাংস্কৃতিক গুরুত্ব দেখতে পাবে।