জলপাইগুড়ি — হাজার বছরের পারাপারে দাঁড়িয়ে থাকা বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির (Vaikunthapur Rajbari) দুর্গাপূজার শেষ পর্ব, বিশেষত বিজয়া দশমীর—এখানকার প্রথা অন্যরকম। সাধারণত যেখানে বিকেলে বা সন্ধ্যায় প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে থাকে, বৈকুণ্ঠপুরে তা সকালেই সম্পন্ন হয়।
দিনের আলোর নিরঞ্জন ও জনসমুদ্র
বিজয়া দশমীর সকাল রাজধানীর উদাসীনতার চাইতেও উজ্জীবিত হয় রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে। সূত্র অনুযায়ী, সকালবেলায় মাকে সুরাহা করে মৃন্ময়ী প্রতিমাকে রাজপরিবারের সদস্যরা এক সুবিন্যস্ত ক্রমে মন্দির থেকে আনা হয়—তার পরই নিরঞ্জনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সকাল থেকেই পর্যটক, ভক্ত ও স্থানীয় মানুষদের ঢল নামে; বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমায়েতটি বড় আকার ধারণ করে। জনস্রোত সামলাতে কোতোয়ালি থানা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের দ্বায়িত্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়।
ভোগ ও বিদায়ের রীতি
নিরঞ্জন শেষ হওয়ার পরে রাজবাড়িতে প্রচলিত ভোগ বিতরণ শুরু হয়। এই ভোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে পান্তা ভাত ও ভাজা ইলিশ—যা সেই অঞ্চলের মাঙ্ক্ষেত্রীর খাবারের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ভক্তরা ঐতিহ্যগতভাবে পান্তা ইলিশে অংশ নেন; পরে সিঁদুর খেলা ও নৃত্য চলে।
- নিরঞ্জন: সকালেই মৃন্ময়ী প্রতিমার নিরঞ্জন সম্পন্ন করা হয়।
- ভোগ: পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা ও স্থানীয় মাছ-পদের ভোগ বিতরণ করা হয়।
- উৎসবমূলক কার্যক্রম: সিঁদুরখেলা, ঢাকের তালে নৃত্য ও বিদায়ের আবেগ।
রথযাত্রা ও প্রতিমা বহন
রীতি অনুযায়ী সোনার দুর্গার প্রতিমাটি সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়; এরপর মৃন্ময়ী প্রতিমার গয়না বা সোনার অলংকার ও রূপোর অস্ত্র মুছে নেওয়া হয়। প্রতিমাকে রথে করে মন্দির চত্বর থেকে বের করে দিঘির ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে। রথ টেনে দিঘির পাড়ে নিয়ে যাওয়া নাগালের বাইরে না—কারণ জনসমাগম অত্যধিক; পুরো পথটি পার হতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগার কথাও সূত্রে উল্লেখ আছে।
সাংঘাতিক মিশ্র অনুভূতি
প্রতিমা যখন দিঘির জলে বিলীন হয়ে যায়, তখন শ্রোতাদের মনে আনন্দ আর বিষাদের মিলিত অনুভূতি কাজ করে। উৎসবের আনন্দময়তা ও বিদায়ের ক্ষোভ একসঙ্গে জাগে—এটাই বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপূজোর বিশেষত্ব। উপস্থিত লোকেরা একে অপরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানালেও মনের গহীনে সবাই একটাই কামনা উচ্চারিত করে:
“সামনের বছর আবার এসো মা”
ঐতিহ্যকে রক্ষা করে আধুনিক নিরাপত্তা
যদিও প্রথাগতভাবে রাজবাড়ির পুজো আধুনিক ভাসরাজ্যের বাইরে থেকে আসে—কোনো মাইকের শ্লোকে নয়, ঢাকের কাঠি ও শাঁখের সুরেই মাত হয়ে ওঠে—তবুও বড় জনসমাগম ও আড্ডার কারণে আধুনিক নিরাপত্তা পদ্ধতি ও পুলিশের উপস্থিতি অপরিহার্য। সূত্রে বলা হয়েছে, কোতোয়ালি থানা ও কেন্দ্রীয় বাহিনী জনরোষ সামাল দিতে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি প্রতিরোধে মাঠে ছিল।
অভিজ্ঞতার সংরক্ষণ ও পর্যটন প্রভাব
একদা রাজপরিবারের কর্তৃত্বে গঠিত এই উৎসব আজও ঐতিহ্যকে ঠিক রেখে চলে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা এই প্রথাগত অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে ফিরেন—যা স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনীতিকে অল্প হলেও প্রভাবিত করে। তবে সূত্রে নির্দিষ্ট আর্থিক বা সংখ্যাগত তথ্য পাওয়া যায়নি; তাই এ বিষয়ে থিতু কোটেশন দেয়া হয়নি।
সার্বিক প্রতিচ্ছবি
বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির বিজয়া দশমী দেখায় কীভাবে এক স্থানীয় সম্প্রদায় অতীত ও বর্তমানকে মিলিয়ে রেখে উৎসব পালিত করে। দিনের বেলায় নিরঞ্জন, পান্তা–ইলিশের ভোগ, সিঁদুর খেলা আর শেষের দিঘি-নিরঞ্জনে উপস্থিতদের মিশ্র অনুভূতি—এসবই এখানে প্রতিমার বিদায়কে শুধুই ধর্মীয় রেওয়াজ নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এক মিলনবিন্দু করে তোলে।
| কার্যক্রম | সময়/বর্ণনা |
|---|---|
| নিরঞ্জন | সকালে—অন্য স্থানে সন্ধ্যার বদলে দিনের আলোতেই |
| রথযাত্রা | রথে প্রতিমা দিঘির দিকে নেওয়া হয়; পথে জনসমাগম বেশি |
| ভোগ বিতরণ | নিরঞ্জনের পর পান্তা ভাত ও ইলিশভাজা বিতরণ |