লক্ষ্মীপুরে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও তদারকি নিয়ে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক মাসের মধ্যে জেলার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দফতরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাগুলোতে ঘুষ দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ মিলেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রকল্প চেইনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কোন দফতরে কী ঘটনা?
উদ্ধৃত অভিযোগ অনুসারে বদলি/বরখাস্ত/স্ট্যান্ড রিলিজ করা কর্মকর্তাদের মধ্য দিয়ে ঘটনার সারসংক্ষেপ এমন—
- বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)— বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ভিডিওতে তাকে ঠিকাদারকে ঘুষ দাবি করার কট্টর পরিমাপের কথাও বলতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
- পৌরসভা— পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুলফিকার হোসেন সংশ্লিষ্ট একটি সড়ক সংস্কার ও ড্রেন নির্মাণ কাজ (খরচ প্রায় ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা) এ নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় দুর্নীতির অনুসন্ধানের জন্য দুদকে তলব করা হয়েছে এবং তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
- জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (পিএইচই)— বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তারের বিরুদ্ধে বিনামূল্যে ৯৩৮৯টি টুইন-পিট ল্যাট্রিন বিতরণ এবং ৫৬ কোটি টাকার ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮-৯ কোটি টাকার ওয়াশব্লক নির্মাণেও তদারকির ঘাটতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
- পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)— জেলার বিভিন্ন প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া হয়।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
জেলায় একের পর এক কর্মকর্তার বদলি ও বরখাস্তের ফলে উন্নয়ন কাজের তদারকি ও বাস্তবায়নে বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও রাজনীতি-সমাজের বিভিন্ন স্তর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে সংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
“নাগরিকদের টাকায় চলা প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার; অন্যথায় উন্নয়নই প্রশ্নবিদ্ধ হবে,”— স্থানীয় একজন সচেতন নাগরিক বলেন।
উল্লেখ্য, পিডিবি কাণ্ডে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলা এবং সেটি তদন্তের মুখে পড়ায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রভাব ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বদলির ফলে চলমান ও নতুন প্রকল্পগুলোর কাজ বিলম্বিত বা স্থবির হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। বিশেষত স্থানীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য অর্থসংবলিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে—যেগুলোর মধ্যে সড়ক সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ ও ওয়াশ প্রকল্প—নির্মাণ মান ও সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন ও সেবার মানে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
| দফতর | অভিযোগের ধরন | প্রকল্পের আনুমানিক পরিমাণ |
|---|---|---|
| পিডিবি | ঘুষ দাবি/ভিডিও | -- |
| পৌরসভা | নিম্নমান নির্মাণসামগ্রী | ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা |
| জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল | ওয়াশ প্রকল্পে অনিয়ম, ল্যাট্রিন বিতরণ | ৫৬ কোটি টাকা (ওয়াশ প্রকল্প), ৯৩৮৯টি ল্যাট্রিন |
| শিক্ষা প্রকৌশল, পাউবো | তদারকির ঘাটতি/অনিয়ম | ৮-৯ কোটি টাকা (ওয়াশব্লক) |
স্থানীয়রা পুলিশের পাশাপাশি দুর্নীতির অনুসন্ধানের জন্য সরকারিভাবে গঠিত তদবির কমিটি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যকারিতা দেখা চান। প্রশাসনও বলছে, যে অভিযোগ প্রমাণিত হবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো তদন্ত চলছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদবিরই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নেয়া হয়েছে। এরপর তদন্তকারীরা তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তই কেবল সমাধান বলে মনে করছেন জেলার বেশিরভাগ সচেতন মানুষ।