জয়পুরহাটে বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দৈনন্দিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০–১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই বলে গ্রাহকরা জানাচ্ছেন। গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুতের অনুপস্থিতি ও অসম পরিবহন-সেবা সরকারি ও কেবল গ্রাহক পর্যায়ে সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
চাহিদা বনাম সরবরাহ: ফাঁক বড়
জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী জয়পুরহাট জেলার দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭২ মেগাওয়াট। তবু বাস্তবে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৬ থেকে ২৮ মেগাওয়াট, যা চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে না পারায় বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
| বিষয় | সংখ্যা |
|---|---|
| দৈনিক চাহিদা | ৭২ মেগাওয়াট |
| বাস্তবে সরবরাহ | ২৬–২৮ মেগাওয়াট |
| দৈনন্দিন গড় লোডশেডিং | ১০–১১ ঘণ্টা |
গ্রাহকরা কেমন জীবনের অগোচরে?
গ্রাহকরা বলছেন, বিদ্যুতের অনির্দিষ্ট ও দীর্ঘ বন্ধের কারণে ঘর-গৃহস্থালি ও কর্মজীবন ব্যাহত হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ সহজ উপকরণেই জীবন চলায়—ফ্রিজ, টিভি না থাকা সত্ত্বেও বাড়িতে আলোকসজ্জা ও পাখা চালাতে ব্যর্থ হচ্ছেন অনেকেই।
“এমনিতেই বিদ্যুৎ থাকে না। তারপর বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে। আগে আমার ১৮০ টাকা বিল আসত, এখন সাড়ে তিন শ টাকা বিল আসছে। আমার বাড়িতে টিভি, ফ্রিজ কিছুই নেই। শুধু বাল্ব ও দুটি ফ্যান চলে। গরিব মানুষ এত বেশি বিল এলে কীভাবে চলবে?”
আরেক গ্রাহক বলেন, “দিন-রাতে অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। রাতে যখনই ঘুমাতে যাই, বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমে ঘুমাতে পারি না। অথচ বিদ্যুৎ বিল কম আসছে না।” এই প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে বোঝা যায় যে ভোক্তা-অর্থনীতি ও সাধারণ জীবনে চাপ বাড়ছে—বাড়তি বিদ্যুৎ-বিলে আর্থিক বোঝা সৃষ্টির পাশাপাশি কাজকর্ম থমকে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ: মিটার রিডারের ওপর হামলা
লোডশেডিং নিয়ে গৃহস্থালি অসন্তোষ তীব্র হওয়ার ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে। জয়পুরহাটের পাঁচবিবির শ্রীমন্তপুর এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক মিটার রিডারকে গ্রাহকরা মারধর করেছে—এ ঘটনা সমিতির পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়টি তুলে দাঁড়িয়েছে।
“মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে,”
এই কথা জানিয়েছেন জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আবু উমাম মো. মাহবুবুল হক। তিনি আরও বলেছেন, যদি জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ বৃদ্ধি না পায় তাহলে এই সংকট থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া কঠিন।
প্রভাব ও জরুরি প্রয়োজনীয়তা
স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎচলাচলের এই অনিশ্চয়তা নিম্নলিখিত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে:
- বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে ভোগান্তি—কম খরচেই চলা গরীব ভোক্তা বেশি বিপদে
- ব্যবসা ও ক্ষুদ্র শিল্পে উৎপাদন ও সেবা ব্যাহত
- নিরাপত্তার অবনতি—কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঝুঁকি
পল্লী বিদ্যুত সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ না নিলে জেলায় এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা জরুরি—তাতে সাব-স্টেশন ও কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, বলে সমিতি আশা করছে।
ফলে কী করা যেতে পারে?
বর্তমান অবস্থায় কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ জরুরি মনে হচ্ছে:
- জেলার চাহিদা-সরবরাহের স্বচ্ছ পরিসংখ্যান ও সময়ভিত্তিক লোডশেডিং তালিকা স্থানীয়ভাবে প্রকাশ করা।
- অপ্রতুল সরবরাহের কারণ ও সময়সীমা নিয়ে সরকারের উচ্চতর পদের সঙ্গে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সমাধান প্রস্তাব করা।
- সাব-স্টেশন ও মাঠকর্মীদের নিরাপত্তা বাড়াতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়।
জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে পাঠানো চিঠিতে স্থাপন করা নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ এবং গ্রাহক অসন্তোষে ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট যে, ইউনিটের সরবরাহ-যোগান বাড়ানো না হলে সাময়িকভাবেই নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এই সংবাদে উল্লেখিত সকল তথ্য জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সদর দপ্তর ও স্থানীয় গ্রাহকদের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে রিপোর্ট করা হয়েছে।