নদী বিক্রির অভিযোগ ও স্থানীয় চিত্র
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা বাজার-পাশের গিরাই নদকে ঘিরে স্থানীয় গবেষক ও বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নদটির অনেক অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেচাকেনার মধ্যে আছে। নদীর বিভিন্ন শাখা—সিন্দুরমতী, বেড়াকুটি, ধরধরা, ভেরভেরী, সিংগীমারী, ছোট ধনী, বড় ধনী, কোটলডাঙ্গা, হাড়িয়ারডারা, পানাকুড়ি ও বাগডাঙ্গা—এসবের মাধ্যমে গিরাই প্রবাহিত হয়ে থাকে।
তবে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও লেখকের অভিযোগ, সরকারি নথিতে নদটি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে নানান অংশে ঘাটতি দেখা যায় বা নদীর সীমানা কেটে আলাদা করা হয়েছে। এই কাজগুলোকে স্থানীয়রা অনৈতিক দখলদারিত্ব ও বেচাকেনা হিসেবে অভিহিত করছেন।
নদীর শ্রেণি ও রেকর্ডে অনিয়ম
প্রচলিত অভিযোগ হচ্ছে, সিএস (খতিয়ান/নামজারি) রেকর্ডে থাকা সত্ত্বেও আরএস (ম্যাপ/নকশা) রেকর্ডে নদীর অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে কিংবা নদীর সীমানা পরিবর্তিত করা হয়েছে। লেখকের দেখা ম্যাপগুলোতে গিরাই নদ সিএস রেকর্ডে থাকলেও আরএস রেকর্ডে নদীর অস্তিত্ব অনুপস্থিত—ফলত: মাঠ পর্যায়ে নদীভিত্তিক সীমারেখা স্পষ্ট নয়।
স্থানীয়দের বক্তব্য ও প্রশাসনের ভূমিকা
প্রতিবেদন কেন্দ্রিক সাক্ষাতকারে দেখা যায়, কিছু দখলদার প্রশাসনকে তাচ্ছিল্য দেখাচ্ছেন এবং তাদের দাবি, “প্রশাসনের লোক তো আমাদের খাজনা নেন, নামজারি করে দেন। বেচাকেনায় তো কোনো অসুবিধা নেই।” অন্যদের বক্তব্য ছিল, সরকার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কখনোই ট্যাক্স নেওয়া বন্ধ করেনি—এমনও ধাঁচের অভিমত পাওয়া যায়।
“নদীর জমি বিক্রি আইনগতভাবে পারা যায় না”—এই যুক্তি বললে একজন দখলদার প্রতিসম্পাদ বলে উঠলেন, “এসি ল্যান্ডের কথা বিশ্বাস করব, না আপনার কথা বিশ্বাস করব? সিএস রেকর্ডে গিরাই নদ—ইউএনও, ডিসি—সবাই জানে।”
এই ধরনের কথোপকথন থেকে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠে—নদী রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি কতৃপক্ষের নজরদারি কোথায় এবং কেন ক্ষেত্রভিত্তিক সমস্যা পূর্বে সমাধান হচ্ছে না। স্থানীয়রা মনে করেন—যাঁদের ওপর নদী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্য থেকেই অনিয়ম ঘটছে।
পরিবেশ ও সুশাসনের উপরে সম্ভাব্য প্রভাব
নদী-ভিত্তিক দখল ও সীমানা পরিবর্তন শুধু জমি-বণ্টন বা নামজারির বিশোধক নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবেশগত ক্ষতি, বাঁধভাঙা, বন্যা চালনা পরিবর্তন ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের হ্রাস। গিরাই নদটি যেখানে একাধিক শাখার সমন্বয়ে গঠিত—সেখানে কোনো একাংশের অবৈধ দখল সমগ্র প্রবাহে বদল এনে দিতে পারে।
- নদী-রেকর্ডে অসংগতি: সিএস ও আরএস রেকর্ডে বিরোধ।
- অনধিকার বেচাকেনা: স্থানীয়দের কথায় নামজারি ও খাজনা প্রদানের দাবি।
- প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা: ইউএনও, ডিসি-র জ্ঞাত থাকার অভিযোগ কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপের অভাব।
আলোচ্য সমস্যা সমাধানের কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন
নোট করতে হয় যে, এই প্রতিবেদনে উপস্থিত তথ্য ও স্থানীয় সাক্ষাৎকারগুলোর ভিত্তিতেই অভিযোগগুলো উঠে এসেছে; সরকারি নথি ও ক্ষেত্রসার্ভে যাচাই ছাড়া কিছুর উপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। তবু কুড়িগ্রামবাসীর দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—
| জিজ্ঞাসা | তথ্যগত গুরুত্ব |
|---|---|
| সিএস-আরএস রেকর্ডে কেন এমন বৈষম্য? | নদীর প্রকৃত সীমানা এবং আইনগত স্বত্ব নির্ধারণে বাধা। |
| দখলদারিত্ব শাপথপত্র কি সরকারি অনুমোদনবিহীন? | অবৈধ বেচাকেনার কারণে পরিবেশ ও জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। |
| স্থানীয় প্রশাসন ও ভূমি কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী? | দায়বদ্ধতা তদন্তে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। |
নদীকে রক্ষার প্রশ্নটি কেবল পরিবেশগত নয়, এটি সামাজিক ও প্রশাসনিক একটি চ্যালেঞ্জ। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী এলাকা থেকে উঠে আসা এই অভিযোগগুলো যথার্থ হলে অবিলম্বে স্বচ্ছ ও নিবিড় তফসিলভুক্ত তদন্ত এবং মাঠপর্যায়ের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং মানচিত্র-নথি মিলিয়ে প্রকৃত সীমানা নিরূপণ করা জরুরি।