পিরোজপুর পৌরসভার কেন্দ্রবিন্দুতে কয়েক বছরের আগেই নির্মিত ডাম্পিং স্টেশনটি এখনও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। সিটিইআইপি প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই স্টেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শহরের бытовিক বর্জ্য এনে সেখানে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার তৈরি করা এবং পরিবেশ দূষণ কমানো। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় এবং প্রশাসনিক-বাণিজ্যিক অনুমোদন-বাধার কারণে প্রকল্পের অনেক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
যোগ্যতা ও বাস্তবতার ফাঁক
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্টেশনে বর্জ্য শোধন, ছাঁকনি ও সংরক্ষণ—সবই পরিকল্পিতভাবে করা হওয়ার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পুরোপুরি স্থাপন হয়নি। ফলে শহরের অনেক আবর্জনা এখনও খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে এবং পুরনো পদ্ধতি চলে আসছে। এর ফলে:
- দূর্গন্ধ উৎপন্ন হচ্ছে এবং চলাচলে ভোগান্তি বেড়েছে।
- মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে যা বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা বাড়ায়।
- জৈব সার উৎপাদন করে বিক্রয় থেকে যে রাজস্ব আসার কথা ছিল, তা বন্ধ আছে।
কর্মীদের অভিযোগ ও জীবিকা
শোধনাগারের শ্রমিকরা জানান, কাজের শুরুর দিকে পিপিই—হাত গ্লাভস, বুট ও মাস্ক—দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাত্র কয়েকদিন দিলেও পরে বন্ধ হয়েছে। শ্রমিক মমতাজ বেগম বলেন, “
আমি পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করি। আমাদের গ্লাভস, বুট জুতা, মাস্ক, ওষুধ দেওয়ার কথা ছিল। শুরুর দিকে এসব জিনিস কয়েকদিন দেওয়ার পর আর আমাদের কিছুই দেয়নি। অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমাদের এই কাজ করতে হয়। প্রায়ই পায়ে সুঁই ঢুকে যায়। হাত-পায়ে বিভিন্ন ধরনের অসুখ হয়। যে টাকা আমাদের দেয় তা আমাদের ওষুধ কিনতে খরচ হয়ে যায়।”
আরেক শ্রমিক ফিরোজা জানান, তিনি ছয় বছর ধরে কাজ করছেন এবং তাদের মজুরি বৃদ্ধি না পেয়ে মাসিক বেতন মাত্র ৭ হাজার টাকা। তিনি বলেন, “গরিব মানুষ এইটা করেই খেতে হয়। তাই কাজও বন্ধ দিতে পারি না।” এসব বিবরণ থেকে পরিষ্কার যে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও জীবনমান নিশ্চিত করা হয়নি।
পৌরবাসীর প্রতিক্রিয়া
পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাইনুল হোসেন ও হুমায়ুন কবির সহ অনেকে জানান, ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় মশার প্রজনন ঘটছে এবং আবর্জনা অপসারণের সময়সূচি অনিয়মিত হওয়ায় দুর্গন্ধ বেশি প্রকট হয়। মাইনুল বলেন, “শহরের অধিকাংশ ড্রেন ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। প্রত্যেকটি ড্রেনে মশার বংশবিস্তার হয়।” হুমায়ুন বলেন, “রাতের বদলে দিনের বেলায় ময়লা ঢোকানো হয়—তার ফলে চলাচলে সমস্যা বেশি।”
রাজস্ব ও প্রশাসনিক জটিলতা
ডাম্পিং স্টেশন তৈরির সময় পরিকল্পনায় জৈব সার বিক্রি করে পৌরসভার রাজস্ব বৃদ্ধির কথাও ছিল। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সার বিক্রয়ের অনুমোদন না থাকায় উৎপাদিত সার বাজারজাত করা যাচ্ছে না। ফলে কারণে প্রকল্প থেকে রাজস্ব আসা বন্ধ রয়েছে এবং বিনিয়োগের সঠিক রিটার্ন আসছে না।
প্রয়োগ ও করণীয়
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন না হওয়াকে দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এখানে যে কার্যকর পয়েন্টগুলো নজরে রাখতে হবে:
- প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করে স্টেশনকে কার্যকরভাবে চালু করা।
- জৈব সার বিক্রয়ের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা।
- শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।
- নিয়মিত ড্রেন ও আবর্জনা অপসারণের রুট নির্ধারণ করে সার্বিক তদারকি বৃদ্ধি।
| বিন্যাস | তথ্য |
|---|---|
| প্রকল্প বছর | ২০২০ |
| খরচ | সাড়ে ৮ কোটি টাকা |
| শ্রমিকদের দাবি করা বেতন | প্রতিমানিক ৭ হাজার টাকা (আবিদিত) |
স্থানীয় প্রভাব ও ভবিষ্যৎ আশা
পিরোজপুর পৌর এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দার স্বাস্থ্য-নির্ভরতা ও শহরের জীবনের মান সরাসরি এই স্টেশনের কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে এবং পৌরসভার পরিকল্পিত রাজস্বও হাতছাড়া হবে। তদারকি বাড়িয়ে ও ব্যবহার উপযোগী তৈরি করে দ্রুত এটি চালু করা হলে শুধুমাত্র পরিবেশে উন্নতি হবে না, বরং কর্মচারীদের জীবনমানও উন্নত হবে ও পৌর রাজস্ব ফিরে পাবে।
এ বিষয় জানা রাখতে পিরোজপুর পৌরসভা, কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগ করা হলেও এখনও তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।