বর্ষার শেষ সময়ে সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চল ও বিভিন্ন উপজেলার মাঠে মরিচ চাষে ব্যাপক সরগরম দেখা যাচ্ছে। যমুনা নদীর তীরবর্তী বেলে-আঁশ ও পলিমাটির উর্বর জমি কৃষকদের কাছে এই ফসলকে লাভজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কম সময়ে ফলন, অনেক দফায় সংগ্রহযোগ্যতা এবং সারাবছর বাজারে চাহিদা থাকায় মরিচ চাষে কৃষকেরা উৎসাহী বলে মাঠপর্যায়ে জানা গেছে।
ফসলের বিস্তার ও উৎপাদন-লক্ষ্য
জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১,৬০০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। জেলা কৃষি অফিসের পরিকল্পনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের খরিফ-১ মৌসুমে জেলায় ২৫১ হেক্টর জমিতে মোট ২ হাজার ৮৬৯ মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৭৫ হেক্টর জমির ফসল তোলা হয়েছে, যার গণনা অনুযায়ী উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৯৪৫ টন। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় আলাদা লক্ষ্য থাকা উল্লেখযোগ্য — সেখানে প্রায় ৭০০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা রয়েছে।
| দিক | পরিমাণ |
|---|---|
| মোট আবাদ (আনুমানিক) | ১,৬০০ হেক্টর |
| খরিফ-১ লক্ষ্যমাত্রা (জেলা) | ২৫১ হেক্টর — ২,৮৬৯ মেট্রিক টন |
| ইতিমধ্যে তোলা ফসল | ১৭৫ হেক্টর — ১,৯৪৫ টন |
| সিরাজগঞ্জ সদর লক্ষ্যমাত্রা | ৭০০ হেক্টর — ১,৭৫০ মেট্রিক টন |
মজুত সুবিধা ও বাজারগত অবস্থা
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, মরিচ তুলনামূলকভাবে কম সময়ে ফলন দেয় এবং বাজারে বর্তমানে দাম ভালো। মাছুয়াকান্দি গ্রামের কৃষক মালেক জানান, প্রতikilোগ্রাম কাঁচা মরিচ এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। রতনকান্দি ইউনিয়নের একডালা গ্রামের কৃষক রঞ্জু বলেন, ৫ শতাংশ জমিতে মাত্র ৫–৭ হাজার টাকা খরচে মরিচ চাষ করলে ধানের তুলনায় বেশি লাভ থাকে; তাই তিনি আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
“অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি নালা কেটে বের করে দেওয়ায় আমরা ফসল রক্ষা করতে পেরেছি, এখন বাজারে ভালো দামও পাচ্ছি,”
এমনটাই জানিয়েছেন সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের ধিতপুর আলাল গ্রামের কৃষক দিয়াআলম ও শাহাদাত হোসেন।
আবহাওয়া ও রোগ-শত্রুর আশঙ্কা
তবে এই মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ফলে বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। জমিতে পানি জমে থাকা, গোড়া পচা, এবং ছত্রাকজনিত রোগ যেমন এনথ্র্যাকনোজ ও ডাইব্যাক দেখা গেছে। পাতা কুঁকড়ে যাওয়া ও বিভিন্ন ধরনের পোকার আক্রমণও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানানো হয়েছে, এসব রোগ ও পোকার আক্রমণ দ্রুত চিহ্নিত করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিলে ক্ষতি কমানো সম্ভব।
- কৃষি বিভাগের পরামর্শ: দ্রুত পানি নিষ্কাশন, রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণ ও সুষম সার ব্যবস্থাপনা।
- মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা: উঁচু, দো-আঁশ বা জৈব পদার্থসমৃদ্ধ জমি বেছে নেয়া এবং বেলে-আঁশ জমিতে রোপণ করাই নিরাপদ।
- প্রচলিত প্রতিকার: নালা খোঁড়া, মাটির ঢালচাল ঠিক রাখা এবং প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও ফাঙ্গিসাইডের নির্ধারিত প্রয়োগ।
চলমান ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত
কৃষি কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, অতিরিক্ত আর্দ্রতার সময় ছত্রাকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; তাই মাঠে নিয়মিত তদারকি জরুরি। হাইব্রিড জাত বেশি দ্রুত ফলন দেয় বলে জৎগাজাতী গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ জানান, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব মরিচ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবু আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও রোগ-জীবাণু নিয়ন্ত্রণ না পেলে লাভের আশায় ছাপ ফেলা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মাঠপর্যায়ের কৃষকরা আশা করছেন, যদি আগামীতে বেশি অতিবৃষ্টি না পড়ে এবং যথাযথ পানি-নিষ্কাশন ও রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে এ মৌসুমে মরিচ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হবে। জেলা কৃষি অফিসও মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কৃষিদের সঙ্গে কাজ করছে।
কীভাবে সাহায্য পাওয়া যাবে: স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে রোগ-নির্ণয়, সঠিক সার ও কীটনাশকের পরামর্শ এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের মরিচ চাষ এখন শুধু একটা ফসল নয়, অনেক পরিবারে আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠছে। তবে লাভ ও ঝুঁকির সমীকরণ ঠিক রাখতে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও কৃষি বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলাই জরুরি বলে কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।