পাট কাটার পরের কাজ শুরু, বিলে-খালে কৃষক-পরিবার সবাই নেমে কাজ করছে
পাবনার গ্রামাঞ্চলে পাট কাটার পরের তৎপরতা একেবারে বাড়ে। ভোরে মাঠে পাট কেটে ঘরে আনার পর এখন বিলে, খালে ও বিভিন্ন জলাশয়ে হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে পাট জাগ থেকে তুলে ধোয়া ও আঁশ আলাদা করার কাজ করছেন কৃষকরা। জেলা সদর, সুজানগর, সাঁথিয়া, বেড়া ও ঈশ্বরদীসহ জেলায় মোট নয়টি উপজেলায় এবার পাটের ফলন সন্তোষজনক বলে কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জমি ও লক্ষ্যমাত্রা: নির্ধারিতের থেকে বেশি জমিতে পাটের আবাদ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি মৌসুমে পাবনায় ৪২,৬৯০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে চাষ হয়েছে ৪৩,৪১৫ হেক্টর-এ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। জেলা কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা অনুযায়ী জেলার জন্য মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছিল ৫৫৮,৯৮৭ বেল। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ও পাটের মান ভালো হওয়ায় এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাব্যতাও ব্যক্ত করা হচ্ছে।
| বিষয় | সংখ্যা |
|---|---|
| লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর) | ৪২,৬৯০ |
| বাস্তবে আবাদ (হেক্টর) | ৪৩,৪১৫ |
| উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (বেল) | ৫৫৮,৯৮৭ |
খরচ, পানির সংকট ও মধ্যস্বত্বভোগীর চাপ
তবে ফলন ভালো থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা নতুন উদ্বেগের মুখে আছেন—উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিশ্চিত নয়। মাঠে-বিলে পাট জাগ দিতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই কৃষককে দূরের জলাশয়ে পাট নিয়ে যেতে হচ্ছে, যা পরিবহন ও শ্রমিক বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগ কম পানিতে পাট পচানোর 'রিবন রেটিং' প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরামর্শ দিলেও নতুন এই পদ্ধতিতে অনেকে এখনও অভ্যস্ত নন।
“বীজ থেকে শুরু করে জমি পরিচর্যা, পাট কাটা, পরিবহন, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানো—প্রতিটি পর্যায়েই শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। পাশাপাশি সার, ডিজেল ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে।”
এই বক্তব্যটি সাঁথিয়ার শিবরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক দিয়েছেন। তার মতো অনেক কৃষকই বলছেন, বর্তমানে বাজারদরে প্রতি মণ নতুন পাটের দাম স্থানীয় হাটে ৩,৩০০ থেকে ৩,৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনে যে খরচ করা হচ্ছে, কৃষিদের হিসাব অনুযায়ী প্রতি মণ উৎপাদনে খরচ প্রায় ৩,৫০০ টাকা। এতে বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে লাভ নিশ্চয়তার বাইরে চলে গেছে।
কৃষকের দাবি ও প্রস্তাবনা
কিছু এলাকায় কৃষকরা হাটে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের উপস্থিতিকে দোষ দেন — তাদের বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা পাট ক্রয়ের মূল্যে প্রভাব ফেলছে এবং সরাসরি ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। তারা দাবি করেন:
- সরকারি বা প্রামাণ্য ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা হোক
- বাজারে কার্যকর নজরদারি বাড়িয়ে অনিয়ম রোধ করা হোক
- উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক
কৃষকরা আশা করছেন, সরকারের নীতিগত হস্তক্ষেপ ও কার্যকর বাজারতত্ত্ব তাদের উৎপাদন খরচ সংকট সামাল দিতে সাহায্য করবে এবং সোনালি আঁশের উৎপাদনে আগ্রহ বজায় রাখবে।
পাবনার গ্রামীণ অর্থনীতিতে পাট একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল; এজন্য এ মৌসুমের শেষ পর্যায়ে বাজার ব্যবস্থা, পরিবহন ও জলসেচের সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে কৃষকের আয়ের বাস্তব চিত্র। কৃষি বিভাগের প্রদত্ত পরামর্শ ও কৃষকের অনুরোধ দু'ই বাস্তবায়িত হলে আয়ের অনিশ্চয়তা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মজীবী কৃষকরা এখন পানিতে পাট জাগিয়ে ধোয়া ও আঁশ আলাদা করার দলের সঙ্গে পরিবারের নারী সদস্য ও শিশু-কিশোরদেরও কাজে যুক্ত করছেন—এভাবে পাট মৌসুমের কাজ পুরো গ্রামীণ সমাজকেও ব্যস্ত রেখেছে।