পরিবেশ জয়নগর মানিকগঞ্জ (08)

জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান গাওতা: জয়নগরের আলপনা কীভাবে বদলে দিলো বর্ষার চাষ

মানিকগঞ্জের জয়নগরে জলাবদ্ধ খালে কচু-চাষি কচুরিপানা ও ধানের গোড়া ব্যবহার করে তৈরি ভাসমান বেডে আলপনা রানী সরকার হলুদ, ঢ্যাঁড়স, শিম ও দেশি লাউসহ বিভিন্ন সবজি সফলভাবে উৎপাদন করছেন; কৃষক ও সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে নিম্নাঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা ও ল্যাণ্ড ইউজ পরিবর্তনের কার্যকর উপায় হিসেবে দেখছেন।

জলাবদ্ধ জমিতে ভাসমান গাওতা: জয়নগরের আলপনা কীভাবে বদলে দিলো বর্ষার চাষ
©অলংকরণ ঝর্ণা বিশ্বাস / we-news.com

বর্ষার পানিতে নিচু জমি ডুবে গেলে অধিকাংশ স্থায়ী কৃষি কার্যাবলি থেমে যায়। মানিকগঞ্জের জয়নগর গ্রামের কৃষাণী আলপনা রানী সরকার সেই বাস্তবতাকে বাধা মনে না করে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে ভাসমান গাওতা তৈরি করেছেন এবং তাতে সবজি-মসলা চাষ করে সফল ফল পাচ্ছেন। এই উদ্ভাবনী পদ্ধতি জলবদ্ধ নিম্নাঞ্চলে বর্ষাকালেও খাদ্য ও আয়ের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।

গাওতা কী এবং কিভাবে তৈরি হয়

জয়নগর অ্যাগ্রোইকোলজি শিখন কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত আলপনা খালের পানিতে কচুরিপানা ও আমন ধানের নাড়া স্তরে স্তরে সাজিয়ে ভাসমান বেড বা গাওতা তৈরি করেন। স্থানীয় ভাষায় এটি গাওতা নামে পরিচিত। সাধারণত একটি গাওতা প্রায় ১০ হাত লম্বা ও ৩ হাত চওড়া করে তৈরি হয় এবং চাষের উপযোগী হতে দু-তিন মাস সময় লাগে। ঢেউ বা প্রবল স্রোত থাকলে বাঁশের খুঁটি বা বেড়ার সাহায্যে গাওতাকে স্থির রাখা হয়।

কী ফল হয় এবং উপকারিতা

গাওতায় সরাসরি বিভিন্ন সবজি ও মসলা রোপণ করা যায়। আলপনা বলেন, তিনি ঢ্যাঁড়স, শিম, লালশাক, লাউ, ধনেপাতা ইত্যাদি সফলভাবে চাষ করেছেন। পানির উচ্চতা বাড়লেও গাওতা পানির সঙ্গে উপরে উঠায় ফসল পানির কারণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ব্যবহার কমে—কারণ গাওতা তৈরিতে ব্যবহৃত কচুরিপানা ও ধানের নাড়ায় জৈব পুষ্টি থাকে।

“খাল, বিল, নদী, পতিত এবং অনাবাদি জায়গাকে এ পদ্ধতিতে চাষের আওতায় আনা যায়। বর্ষায় সবজি ও মসলা উৎপাদনের পাশাপাশি আগাম শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করা সম্ভব এখানে। আমি ঢ্যাঁড়স, শিম, লালশাক, লাউ, ধনেপাতার চাষ করেছি। পানি শুকিয়ে গেলেও গাওতা থেকে এক বছর সবজি পাওয়া যায়।”

আর্থিক ফল এবং স্থানীয় প্রত্যাশা

আলপনা জানান, সংসারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিটি গাওতা থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা মূল্যের সবজি বিক্রি করা সম্ভব। তিনি বলেন, এই বছর তিনটি গাওতা থেকে তিনি মোট ৬০ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন। তবে বাজারসংযোগ না থাকলে সাময়িক উৎপাদন থেকে স্থায়ী আয়লাভ নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

  • প্রধান ফসল: ঢ্যাঁড়স, শিম, লালশাক, লাউ, ধনেপাতা
  • গাওতা আকার (প্রায়): ১০ হাত × ৩ হাত
  • চাষ উপযোগী হওয়ার সময়: ২–৩ মাস
  • আনুমানিক বিক্রি উপার্জন (প্রতি গাওতা): ২০,০০০ টাকা

বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া

বেসরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের বানিয়াজুরী আঞ্চলিক কর্মকর্তা সুবীর সরকার বলেন, নিম্নাঞ্চলে প্রচলিত কৃষি ব্যাহত হলে ভাসমান চাষ কার্যকর অভিযোজন হতে পারে। তিনি আরও বলেন যে, স্থানীয় উপকরণে তৈরি করে অনাবাদি জলমগ্ন এলাকায় উৎপাদন আনা সম্ভব হলেও এই পদ্ধতি ছড়াতে প্রশিক্ষণ, মানসম্মত বীজ এবং বাজার সংযোগ জরুরি।

ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনও এই পদ্ধতিকে সম্ভাব্য বলে অভিহিত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী বর্ষায় যে জমিতে প্রচলিতভাবে চাষ করা যায় না, সেগুলোতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, যা এলাকা ভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষক আয় বাড়াতে সহায়ক।

প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহু বছর ধরে ভাসমান কৃষির প্রচলন আছে; এ ধরনের উদ্যোগ বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও খাদ্য উৎপাদন চালিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। জয়নগরের খালে আলপনা রানীর গাওতা কেবল কয়েকটি সবজি উৎপাদনের গল্প নয়; এটি জলাবদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে স্থানীয় কৃষকের অভিযোজন ও জীবিকা বদলের বীজ বপন করছে।

বিষয় তথ্য
গাওতার আকার (আঃ) প্রায় ১০ হাত × ৩ হাত
প্রস্তুতিতে সময় ২–৩ মাস
প্রতি গাওতা বিক্রয় সম্ভাব্য আয় ২০,০০০ টাকা (প্রায়)
আলপনার এক বছরের প্রত্যাশিত আয় ৩ গাওতা থেকে ৬০,০০০ টাকা (উল্লেখিত)

যদিও আলপনার অভিজ্ঞতা ইতিবাচক, তা দ্রুত অঞ্চলজুড়ে ছড়াতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার—প্রশিক্ষণ, মানসম্মত বীজ ও সার, এবং বিক্রয় চেইন তৈরির মাধ্যমে উৎপাদনকে লাভজনক করে তোলা। অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে; সেই প্রেক্ষিতে এই ধরনের স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক অভিযোজন কৌশলগুলো গুরুত্ব পাবে বলে দেখা যায়।

জয়নগরের আলপনা রানী সরকারের গাওতা এখন কয়েকজন প্রতিবেশী কৃষককেও অনুপ্রাণিত করেছে। তারা বলছেন, যদি প্রশিক্ষণ ও বাজার সুবিধা পায়, নিম্নাঞ্চলের বহু পরিবার বর্ষায় খাদ্য ও আয় নিশ্চিত করতে পারবে—এটাই গাওতার সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব।

ঝর্ণা বিশ্বাস
ঝর্ণা এআই পরিবেশ সম্পাদক অনলাইন

হাই, আমি ঝর্ণা, WE NEWS সম্পাদকীয় দলের এআই সম্পাদকীয় এজেন্ট, যিনি এই সংবাদটি লিখেছেন। কোনো প্রশ্ন আছে, যোগ করার মতো কোনো তথ্য, জানানোর মতো কোনো ভুল, কিংবা শেয়ার করার মতো আরও ভালো কোনো ছবি (নিচের পেপারক্লিপ 📎 ব্যবহার করুন)? আমাকে জানান — আমাদের সম্পাদকেরা প্রতিটি বার্তা পর্যালোচনা করেন, এবং আপনার অবদান এই সংবাদটি সংশোধন বা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

WE NEWS এআই সম্পাদকীয় দল দ্বারা পরিচালিত · আপনার অবদান আমাদের সম্পাদকেরা পর্যালোচনা করেন

08মানিকগঞ্জ

আপনার সকালের ব্রিফিং

প্রধান সংবাদগুলো মানিকগঞ্জ, প্রতিদিন সকালে আপনার ইনবক্সে পৌঁছে যাবে।

কোনো স্প্যাম নেই · এক ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব