গর্জনিয়া বাজার—প্রায় দেড় বছর ধরে এখানে চলছে তহসিল অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করা খাস কালেকশনের নামে বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অনিয়ম। স্থানীয়রা বলছেন, বাজারে মুক্সেদার ও প্রতিদিনকার টোল নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই চলেছে এবং প্রশাসনিক স্তর থেকে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা পাচ্ছেন না।
অভিযোগের সারমর্ম
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নেতারা অভিযোগ করেন, যে বাজারটি আগে ২৫ কোটি টাকা ইজারার ডাক উঠেছিল, সেটি গত প্রায় দেড় বছর ধরে বাজার হলে প্রতিদিন ও প্রতিবাজারে টোলসহ কোটি টাকার রোজগার হচ্ছে। অনেকে আশংকা করছেন, এ রাজস্বের কতটা সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে তা গোপন রাখা হচ্ছে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জানান—প্রতিদিন বা প্রতিবাজারে সামান্য হিসেব করলে এক লাখ টাকার মতো টোল আদায় হতে পারে। এক ব্যবসায়ী দাবি করেন, বছরের হিসেবে তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং দেড় বছরে হয়ে যায় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
হাইকোর্টের নির্দেশ ও প্রশাসনের অনুত্তর
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন থেকে ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন-১৯১৩/২০২২ এর রায়ের আলোকে গর্জনিয়া বাজার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় সূত্রে দাবি, রায়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি কার্যকর করেননি।
কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের এডভোকেট সাইফুদ্দিন খালেদ ঘটনাটিকে আদালত অবমাননা বলে অভিহিত করে বলেন যে, উচ্চ আদালতের রায়কে আড়াল করা হলে তাতে সুনির্দিষ্ট অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
- দোকানদার আব্দুল্লাহ বলেন, আগের মতো টোল নির্ধারিত নিয়মে নেওয়া হচ্ছে না; গরুর বাজার বন্ধ থাকায় আয়ের ধারাও কমে গেছে।
- মুদি দোকানি ফজু বলেন, প্রতিবাজারে কম করে হলেও ১ লাখ টাকা টোল আদায় হয়—বার্ষিকভাবে তা প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকা হয় বলে তার ধারণা।
- টং দোকানি মনির সওদাগর জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যায় তহসিল অফিসের কর্মী কনক পাল হিসাব করেন বলে শোনা যায়, তবে তিনি নিশ্চিত নয়েন।
- ব্যবসায়ী নেতা কবির আহমদ বলেন, গরুর বাজার বন্ধ থাকায় স্থানীয় গরু বিক্রেতারা কষ্ট পাচ্ছেন—এ কারণে গরু বাজার পুনরায় চালুর জন্য তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া অস্বচ্ছ
গর্জনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা কানন পাল সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন এবং নির্দেশনা পেলেও তিনি তহসিলদার বা ইউএনও-এর থেকে জানতে বলছেন। তহসিলদার সামিউলও সাংবাদিকদের প্রশ্নে উত্তর দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং ইউএনওকে দেখানোর পরই কিছু বলা হবে বলে উল্লেখ করেছেন।
“আমি কিছু বলব না, স্যার (তহসিলদার) থেকে জানতে পারেন,”
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া এলাকায় সন্দেহ বাড়িয়েছে যে সংশ্লিষ্টরা তথ্য প্রকাশ না করে রাজস্ব সংক্রান্ত অনিয়ম লুকানোর চেষ্টা করছেন।
প্রভাব এবং স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
বাজারের অনিয়ম সম্পর্কে অবগত এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের কাছে দাবি করছেন—স্বচ্ছ হিসাবপত্র দেখিয়ে জানানো হোক, কত টাকা বাজার থেকে আদায় হয় এবং তার মধ্যে কতটা সরকারি রাজস্ব হিসেবে জমা হচ্ছে। এছাড়া, গরু বাজার না থাকায় কৃষক ও বিক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন—এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ধাক্কা দিচ্ছে।
| দিক | স্থানীয় তথ্য/দাবি |
|---|---|
| আগে ইজারার ডাক | ২৫ কোটি টাকা |
| প্রতিবাজার আনুমানিক টোল | প্রায় ১ লাখ টাকা |
| বার্ষিক হিসেবে ব্যবসায়ীর দাবিকৃত আয় | ১ কোটি ৪ লাখ টাকা (প্রতিবছর) |
| দেড় বছরে দাবি করা মোট আয় | প্রায় ২ কোটি টাকা |
স্থানীয়দের দাবি এবং হাইকোর্টের নির্দেশের আলোকে যদি প্রশাসন স্বচ্ছতা বজায় না রাখে, তাহলে ব্যবসা-জীবন ও সরকারি রাজস্ব—দোনোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতনরা।
এই ঘটনায় উপযুক্ত প্রশাসনিক জবাব না পাওয়া পর্যন্ত স্থানীয়রা আন্দোলন আর সামাজিক তদন্তের আশঙ্কা করছেন। বিচারপ্রক্রিয়ার নির্দেশ অমান্য হওয়ার অভিযোগ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তদন্তে ত্বরান্বিত করতে অনুরোধ করছে ব্যবসায়ী ও আইনজীবীরা।
রামু থানা ও উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি; সঠিক তথ্যের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের থেকে লিখিত ব্যাখ্যা বা হিসাবপ্রতিপন্নকরণ দাবি করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
জান্নাতুল ফেরদৌস, কক্সবাজার থেকে