রাজশাহীর পুঠিয়ার চারআনি রাজবংশের শেষ পুরুষ নরেশ নারায়ণ-এর দ্বিতীয় স্ত্রীর, রাণী কমর বেগম-এর ব্যবহৃত কাঠের পালঙ্ক এবং দীর্ঘদিন ধরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি পুরোনো সামগ্রী উদ্ধার করেছেন স্থানীয় প্রশাসন। ওই পালঙ্ক উদ্ধার করা হয়েছে স্থানীয় এক মাছচাষীর বাড়ি থেকে, যা পুঠিয়া রাজবাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দুরে অবস্থান করছিল।
উদ্ধারের প্রেক্ষাপট
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান জানান, বিষয়টি জেলার প্রশাসকের নজরে এসে উদ্ধারের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে ইকবালুর বাসার থেকে পালঙ্কটি সংগ্রহ করা হয়। উদ্ধার অভিযানে উপস্থিত ছিলেন পুঠিয়া রাজবাড়ির কাস্টোডিয়ান হাফিজ উদ্দিন, স্থানীয় সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিরা।
উদ্ধারকৃত সামগ্রীর তথ্য
উদ্ধারের সময় পাশেকের বাড়ি থেকে আরো কিছু পুরাতন জিনিস পাওয়া যায়। স্থানীয়দের বক্তব্য এবং প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী উদ্ধারকৃত সামগ্রীগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হল।
| উপকরণ | উদ্ধারের স্থান | নোট |
|---|---|---|
| কাঠের পালঙ্ক (রাণী কমর বেগমের ব্যবহার) | ইকবালুরের বাড়ি (মাছচাষী) | পুঠিয়া রাজবাড়ির জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে |
| পুরোনো খাট ও ড্রেসিং টেবিলের কিছু অংশ | ইয়াকুব স্বর্ণকারের বাড়ি | পার্শ্ববর্তী উদ্ধার সামগ্রী |
| তিনটি ঝাড়বাতি | ভোলানাথ দত্তের বাড়ি | ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে বিবেচিত |
স্থানীয় বর্ণনা ও দাবি
উদ্ধার হওয়া পালঙ্ক সম্পর্কে মাছচাষী ইকবালুর (ইলু) জানিয়েছেন, তার বাবা আবদুর রহমান খান ছিলেন স্কুলশিক্ষক এবং তিন মাসের বেতনের সংগ্রহ করে তিনি প্রায় ১৯৯১ সালের দিকে এই পালঙ্কটি কেনেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কমর বেগমের মেয়ে রেজিনা জামাল মামলায় জড়িয়ে আর্থিক কষ্টে পড়লে পরিবারের কিছু জিনিস বিক্রি হয়ে যায়—তার মধ্যে এই পালঙ্কও ছিল বলে বলা হচ্ছে।
"পালঙ্কটি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ঘরে ছিল; পরে সেটা স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হলেও ইতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এসে জেলা প্রশাসক উদ্ধারের নির্দেশ দেন," — ইউএনও লিয়াকত সালমান।
সংরক্ষণ ও প্রদর্শন পরিকল্পনা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাফ নির্দেশনা অনুযায়ী উদ্ধারকৃত সব সামগ্রী পুঠিয়া রাজবাড়ির জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনীর কারণে প্রস্তুত করা হবে। এই উদ্যোগকে উৎসাহজনক বলে দেখছেন রাজবাড়ি ও পুঠিয়ার সংস্কৃতি-ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা অনেকে, কারণ দীর্ঘদিন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক সামগ্রী উদ্ধার হলে স্থানীয় ইতিহাসের একটি উপাদান পুনরায় আলোচনায় আসে।
উদ্ধার অভিযানটি মোটামুটি তিন ঘণ্টা চলে এবং এতে ইউএনও লিয়াকত সালমান নিজে নেতৃত্ব দেন। স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংবাদিক কর্মীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির প্রাক্তন সভাপতি ও প্রাক্তন মেয়র আসাদুল ইসলাম আসাদ এবং পুঠিয়া সাংবাদিক সমাজের সভাপতি ইসলাম লিটন।
ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, নরেশ নারায়ণ নাটোরের রাজা জিতেন্দ্র নাথের মেয়ে সুরেশ্বরীকে প্রথমে বিবাহ করেন এবং পরে কলকাতায় গিয়ে মুসলিম কমর বেগমের সঙ্গে পরিচয় ও বিবাহ হয়। কমর বেগম পরবর্তীতে পুঠিয়ায় এসে রাজপরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত এসব সামগ্রী স্থানীয় মানুষের জানার সুযোগ করে দিলে পুঠিয়ার ঐতিহ্য ও পর্যটন সম্ভাবনাও বাড়বে। তবে এগুলোর সঠিক পরিচয় ও বয়স নিরূপণ, সংরক্ষণপ্রক্রিয়া এবং পর্যটক-প্রদর্শন সংক্রান্ত ব্যবস্থা আরও গবেষণা ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের ওপর নির্ভর করবে।