নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকায় মসজিদ ও মন্দির কেবল একসঙ্গে দাঁড়িয়ে নেই—ওরা প্রতিদিনই পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। পশ্চিম পাশে পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদে নামাজ-আদায় মানুষের পর্যায় দেখা যায়; এর ঠিক ১০০ ফুট পূর্বে আছে মহিষখোলা সর্বজনীন দুর্গা মন্দির। পাকা সড়ক ধরে চিত্রা নদীর কূল ঘেঁষে হাঁটলেই চোখে পড়ে সেই আঙ্গিনা — এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির।
দীর্ঘসূত্রে গড়া পারস্পরিক শ্রদ্ধা
স্থানীয়রা জানান, গত ৪১ বছর ধরে দুই সম্প্রদায় এখানে মিলেমিশে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালিয়ে আসছে। নামাজের সময় মণ্ডপ থেকে বাজানো গান-বাদ্য থেমে যায়; নামাজ শেষে আবার অনুষ্ঠান শোনা যায়—এ ধরনের ব্যাবস্থাই এখানকার ধর্মীয় সহনশীলতার নিদর্শন।
মসজিদে নামাজ-আদায় আসা স্থানীয় সিদ্ধিকুর রহমান বলেন, “আমরা যার যার ধর্ম পালন করি। নামাজের সময় পূজার গান-বাজনা বন্ধ থাকে। নামাজ শেষে আবার শুরু হয়। এ নিয়ে কখনও সমস্যা হয়নি।”
“আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, তারা তাদের ধর্ম পালন করেন। এতে কোনো সমস্যা হয় না। ইসলাম অন্যের ধর্মকে অসম্মান করতে শেখায় না, বরং সব ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায়।” — হাফেজ মাওলানা এনামুল হক, খতিব
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শুভংকর সরকারও এ ঐক্যের কথাই বলেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই দুই ধর্মের মানুষ এখানে অসাম্প্রদায়িকভাবে অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন এবং একে অপরকে সাহায্য করছেন। পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থী প্রদীপ চৌধুরী বলেন, পাশাপাশির এই দৃশ্য দেখলে ভালো লাগে; মানুষরা একে অপরের ধর্মকে সম্মান করেন।
জেলার পূজার পরিসংখ্যান ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট
এই বছর নড়াইল জেলায় মোট ৫৪৩টি পূজা মণ্ডপ হয়েছে। জেলায় উপজেলার ভিত্তিতে মণ্ডপবিন্যাসের সংখ্যা নিম্নরূপ:
| উপজেলা | মণ্ডপের সংখ্যা |
|---|---|
| নড়াইল সদর | ২৪৯ |
| কালিয়া | ১৪৪ |
| লোহাগড়া | ১৫০ |
মহিষখোলা অঞ্চলের অনন্য এই মিলেমিশে বসবাসের ছবি নড়াইলের সামাজিক জীবনে সম্প্রীতির এক উল্লেখযোগ্য অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চিত্রা নদীর তীরবর্তী এই এলাকায় নদীর ঘাটে একসঙ্গে অজু ও পূজার সামগ্রী পরিষ্কারের দেখা মেলে—কখনো কেউ নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তো কেউ পূজার পাত্র-পাত্রী পরিস্কার করছেন।
সম্প্রতি ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা
দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় কারণে উত্তেজনার খবর সময়ে সময়ে প্রকাশ পায়; সেই প্রেক্ষাপটে মহিষখোলার সহনশীলতার চিত্র স্থানীয়দের জন্য আশার বার্তা। সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকা পারস্পরিক শ্রদ্ধা সচেতন উদ্যোগ ও দৈনন্দিন আচরণ থেকে গড়ে ওঠেছে—কেরোটি সংগঠিত অনুষ্ঠান না থাকলেও পারস্পরিক সমঝোতা বজায় রাখতে স্থানীয়ভাবে যেসব রীতি মানা হয়, সেগুলোই এই সহাবস্থানের ভিত্তি।
স্থানীয়রা বলে, বড় কোনো উৎসব হলেও আগে থেকে পরস্পরকে জানিয়ে নেওয়া, অনুষ্ঠান চলাকালীন শব্দ-সামঞ্জস্য বজায় রাখা ও মণ্ডপ-ভর্তি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় কমিটির ব্যবস্থাপনার ভূমিকা থাকে।
- পারস্পরিক সম্মান — নামাজ ও পূজার সময় একে অন্যের আচার-অনুশীলনে বাধা নেই।
- স্থানীয় নিয়মাবলী — অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শব্দ ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের অপ্রকাশিত রেসিপি মানা হয়।
- সামাজিক সম্পর্ক — প্রতিবেশীদের মধ্যে দৈনন্দিন সহযোগিতা ইহা বজায় রাখে।
নজরে রাখার মতো বিষয় হলো—এ ধরনের সহাবস্থান বজায় রাখতে স্থানীয় সামাজিক কাঠামো, সাধারণ মানসিকতা ও নেতাদের মধ্যকার সম্পর্কই মূল চালিকাশক্তি। মহিষখোলার এই উদাহরণ অন্য এলাকাগুলোর জন্য পাঠকীয় অনুশীলন হতে পারে—কীভাবে ছোট ছোট সামাজিক বিধি ও পারস্পরিক সম্মান ধরে বৃহত্তর শান্তি নিশ্চিত করা যায়।
মহিষখোলার পাশে, নদীর তীরে বসে থাকা মসজিদ ও মন্দিরের ছায়ারা শুধু স্থাপনা নয়; তারা নড়াইলের বহুত্বপূর্ণ সামাজিক জীবন ও অটুট সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়ে আছে।