ভাগ্য বদলের আশায় প্রবাসে গিয়েছিলেন কলারোয়ার কেয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের যুবক শুভ দাস। কিন্তু দীর্ঘ ৩ মাস ২৫ দিন পর কফিনবন্দি মরদেহে তিনি ফিরে এলেন। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে তার মরদেহ শ্রীপতিপুর গ্রামে পৌঁছালে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।
পরিবারের আশা ও হারানো স্বপ্ন
শুভ দাস ওই গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস ও ধানচাতাল শ্রমিক শিখা দাসের মেজো ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে পরিবারের ভবিষ্যৎ হিসেবে শুভর উপর ছিল সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা। সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে পরিবারের আর্থিক তদবিরে জমি ও গবাদি পশু বিক্রি করে এবং ধার-দেনা করে বাবার ছোট রেমিটান্স ও সংসারের খরচ মেটাতে শুভকে লেবাননে পাঠানো হয়েছিল।
পরিবার ও গ্রামের মানুষদের কথায়, শুভ একটি নিয়মিত উপার্জনকারীর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ যান—তাদের দারিদ্র্য-কষ্ট দূর করা ও ধার-দেনা মেটানোর উদ্দেশ্যেই। কিন্তু ১২ মে লেবাননের দক্ষিণ নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলার একটি ঘটনায় শুভ সহ তিন বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। অন্য দুই প্রবাসীর দেহ আগেই দেশে আনা হলেও শুভর মরদেহ ফিরিয়ে আনা নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও জটিলতার কারণে বিলম্বিত হয়।
আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং ও প্রশাসনিক সহায়তা
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম জানান, শুভ দাসের মরদেহ দেশে আনার জন্য দরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন—
“লাশ বহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং যুদ্ধে মারা যাওয়ার কারণে ৫০ হাজার টাকা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।”
এই ঘোষণাটি পরিবার ও গ্রামের লোকদের মধ্যে কিছুটা সদলবলের রূপ দিয়েছে, তবে হারানো মানুষের অর্থ তুল্য নয়—স্থানীয়দের অনুভবও একই রকম।
গ্রামবাসীর প্রতিক্রিয়া ও শেষকৃত্য
মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনার পর স্থানীয় মানুষ ও আত্মীয়রা তাকে শেষকৃত্যে বিদায় জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্রামের বয়স্করা বললেন, বিদেশে প্রেরিত যুবকরা প্রায়শই পরিবারে কেমনভাবে ভরসা হয়ে ওঠে—শুভর মৃত্যুর শোক পরিবারকে যেমন ভেঙে দিয়েছে, তেমনি গ্রামের মাঝে একটা সতর্কবার্তা ছড়িয়েছে যে বিদেশযাত্রার ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে।
- ঘটনার তারিখ: ১২ মে — লেবাননের জেবদিন এলাকায় ড্রোন হামলা
- মরদেহ ফেরত: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর — কলারোয়ার শ্রীপতিপুর গ্রামে পৌঁছন
- প্রদানকৃত ভাতা: লাশ বহনের জন্য ৩৫,০০০ টাকা; যুদ্ধে নিহত সনদ হিসেবে ৫০,০০০ টাকা
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নাম | শুভ দাস |
| গ্রাম | শ্রীপতিপুর, কয়লা ইউনিয়ন, কলারোয়া, সাতক্ষীরা |
| ঘটনা | লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা (১২ মে) |
| প্রদানকৃত অর্থ | ৩৫,০০০ টাকা (লাশ বহন) + ৫০,০০০ টাকা (যুদ্ধে মরার ভাতা) |
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
শুভর পরিবার ইতিমধ্যেই কিস্তি ও ধার-দেনার বোঝা নিয়ে চাপের মধ্যে ছিল। অভিভাবকরা দিয়েছেন জানায়, শুভর উপার্জন চলে গেলে ধার পরিশোধে অসুবিধা বাড়বে। গ্রামের মানুষ বলেন, একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল সদস্যকে হারানো মানে শুধু মন্থর শোক নয়; তা সরাসরি আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
স্থানীয় নেতারা এবং পরিবারের সদস্যরা প্রতিনিয়ত প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদে প্রেরণ ও তাদের শ্রমনীতির বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি তুলছেন। পাশাপাশি তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে দেশে ফিরে আসা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির ওপর সরকারী নজর দাবি করেছেন।
শেষ কথা
শুভ দাসের কফিনবন্দি দেহ ফিরতে পরিবার ও গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষ হলো, কিন্তু তার সঙ্গে থাকা ধ্বংসস্তুপ—ঋণ, একাকিত্ব ও অব্যক্ত ব্যর্থতার অনুভূতি—সেসব সহজে মেটবে না। সরকারি ভাতা সাময়িক সহায়তা দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন—স্থানীয় স্তর থেকে তথ্য-প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ বিদেশ যাত্রার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আরেকটি পরিবারের ভবিষ্যৎ একইভাবে নষ্ট না হয়।