কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ-১ আদালত সোমবার (১৭ আগস্ট) এক মামলায় মো. সেলিম নামে এক ব্যক্তিকে জাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালত একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও দণ্ড অদায়নের ক্ষেত্রে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। মামলায় অপর তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আদালতে শুনানি ও রায়ের মূল তথ্য
বিচারক সুপ্রিয়া রহমান সাড়ে ১১টায় রায় ঘোষণা করেন। মামলায় অভিযোগ ও আদালতের রায় অনুসারে, ২০১৫ সালের ২৪–৩০ জুলাইয়ের মধ্যে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার স্বল্পযশোদল ভুবিরচর গ্রামের আবু বাক্কার সিদ্দিকের পরিবারের মধ্যে বিবাদ এবং শারীরিক হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই রাত ১১টা থেকে পরের সকাল ৬টার মধ্যে কোনও এক সময় আসামিরা ঘরে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আবু বাক্কার সিদ্দিককে হত্যা করে।
পরের দিন সকালে বাড়ির একজন সদস্য স্থানীয়দের জানায় যে তিনি — অভিহিত কাগজে বলানো— ‘আমি আমার বাবাকে হত্যা করেছি’ বলে চিৎকার করেন এবং জীবন রাখবেন না বলেও জানান। পরে তিনি আত্মহত্যার চেষ্ঠা করলে পরিবারের লোকজন তাকে আটক করে। নিহতের স্বজনরা পরে লাশ দেখতে পেয়ে তা হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার পটভূমি ও তদন্ত
মামলা সূত্রে জানা গেছে, নিহত আবু বাক্কার সিদ্দিকের সঙ্গে স্ত্রী আছিয়া খাতুন-এর পারিবারিক বিরোধের সূত্র ধরেই ঘটনা ঘটেছিল। ওই বিরোধ বাড়তি উত্তেজনায় ভিন্ন সদস্যদের সঙ্গে মনোমালিন্য এবং শারীরিক সহিংসতার দিকে এগিয়েছিল। নিহতের ছোট ভাই মো. আবু হানিফ ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতিপক্ষ হিসেবে সেলিম, জাবেদ, আছিয়া খাতুন ও ময়না খাতুনসহ অজ্ঞাত আরও ২–৩ জনকে আসামি করা হয়।
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২৪ জুলাই ২০১৫ | আবু বাক্কার ও পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ শুরু |
| ৩০ জুলাই ২০১৫ (রাত) | আবু বাক্কার সিদ্দিককে ধারালো অস্ত্রে আঘাত করে হত্যা |
| ৩১ জুলাই ২০১৫ | নিহতের ভাই মামলা করেন (কিশোরগঞ্জ মডেল থানা) |
| ১৭ আগস্ট ২০২৬ | কিশোরগঞ্জ অতিরিক্ত দায়রা জজ-১ আদালত রায় ঘোষণা—মো. সেলিমকে যাবজ্জীবন দণ্ড |
আদালতে উপস্থিতি ও প্রভাব
রায় ঘোষণার সময় মো. সেলিম আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। অপর তিন আসামি—নিহত আবু বাক্কারের স্ত্রী মোছা. আছিয়া খাতুন, ছেলে মো. জাবেদ ও পুত্রবধূ মোছা. ময়না খাতুন—উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ খালাস করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘকাল বিরতিতে থাকার পরও মামলাটি গুরুত্ব বোঝায়। স্থানীয় সমাজে পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে সহিংস ঘটনায় রূপ নেওয়া এই ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। রায় ঘোষণার পর স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে—এক দিকে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা, অন্য দিকে পরিবার-সমাজের ক্ষত এখনও স্থায়ী।
আইনি খবর ও পরবর্তী করণীয়
রায় অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিপক্ষে সাধারণত আপিল করার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের নিকটাত্মীয়দের জন্য সামাজিক পুনর্বাসন, সংঘাত মীমাংসার প্রচেষ্টা ও মানসিক সহায়তা স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ সংস্থার ভূমিকা গুরুত্ববহ হবে।
- মামলার সময়কাল: ২০১৫ থেকে ২০২৬—প্রায় ১১ বছর।
- রায়: যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম দণ্ড।
- অন্যান্য আসামি: আছিয়া খাতুন, জাবেদ, ময়না—খালাস।
স্থানীয় আইনজীবী ও আদালত সূত্রের বরাত ছাড়া রায় ও মামলার বাকি প্রমাণাদি নিয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ হয়নি। অভিযুক্ত ও বিচারের পারিপার্শ্বিক বিষয়ে আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিস্তারিত প্রতিবেদন আদালতের নথি থেকে পাওয়া গেলে তা সর্বজনের জানানো হবে।
এই ঘটনায় কিশোরগঞ্জবাসীর মধ্যে পারিবারিক সংঘাত ও গৃহসহিংসতা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নও আবার উঠে এসেছে। আদালতের এই রায় স্থানীয় সমাজে ন্যায়বিচার ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার বাণী হিসেবে দেখা হলেও আক্রান্ত পরিবার ও প্রতিবেশীদের জন্য ক্ষত কোমল থেকে যায়।