উপকূলীয় জেলা বরগুনা-র চরাঞ্চল, নদীর তীর ও গ্রামীণ জনপদে গবাদিপশু পালনের সম্ভাবনা ব্যাপক। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পশুখাদ্য, চিকিৎসা ও নিশ্চিত বাজারের অভাবে এই খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ওঠেনি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে গবাদিপশু পালন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী চালিকা শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
বর্তমান চিত্র ও সাংগঠনিক সমস্যাগুলো
বরগুনার সদর, পাথরঘাটা, আমতলী ও তালতলীসহ বিভিন্ন উপজেলায় গবাদিপশু—গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া—পালন দীর্ঘ সময় ধরেই চলছে। অনেকে বাড়ির আঙিনা, গোয়ালঘর বা চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক চারণভূমি ব্যবহার করে পশু পালন করছেন। নদী ও চরাঞ্চলে জন্মানো ঘাস, ধানের খড়, ভুসি ও খৈল প্রভৃতি সহজলভ্য হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কম খরচে পশু পালন সম্ভব হলেও বাস্তবে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে খামারিদের।
অবকাঠামো ও বাজার সংযোগের ঘাটতি
জেলার প্রাণিসম্পদ বিভাগে চলমান প্রশিক্ষণ, টিকাদান ও চিকিৎসাসেবা থাকলেও খামারিরা মূলত নিম্নোক্ত সমস্যার কথা জানাচ্ছেন:
- উচ্চমূল্যের পশুখাদ্য ও জোগান সহজে না থাকা;
- রোগ-ব্যাধির ঝুঁকি ও দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব;
- উৎপাদিত দুধের জন্য নিশ্চিত বাজার না থাকা ও শীতলীকরণ-প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাব।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান জেলার গবাদিপশু পালনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেছেন—
“বরগুনায় গবাদিপশু পালনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে পশু পালন করা গেলে দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়িয়ে এ খাতকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।”
চাকরি, আয় ও স্থানীয় শিল্পের সম্ভাবনা
উন্নত জাত ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গবাদিপশু পালন দুধ ও মাংস উভয় ক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম। উৎসাব্বলম্বী কোরবানির সময় গ্রামে পশুসহ বিক্রয় থেকে অর্থপ্রবাহ ঘটে—এ ধরনের মৌসুমী বাজারকে স্থায়ী আয় কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। উৎপিত দুধকে ঘিরে যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হিসেবে দই, ঘি, ছানা, মাখন ও পনির তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও আয় বাড়বে। তাছাড়া গোবর থেকে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করলে কৃষি-জ্বালানি ও পরিবেশগত দিকেও সুফল মিলবে।
প্রস্তাবিত পথ: কী করলে বাস্তবে লাভবান হওয়া যাবে
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে নিম্নোক্ত উদ্যোগগুলো নিলে জেলা পর্যায়ে গবাদিপশুপালনকে শক্তভাবে গড়ে তোলা সম্ভব:
- দুধ সংগ্রহকেন্দ্র ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন করা—দুধ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে;
- পশুখাদ্য উৎপাদন ও চাষ পরিকল্পিতভাবে চালু করা, বিশেষ করে চরাঞ্চলে ঘাসচাষের সম্প্রসারণ;
- সহজঋণ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে অল্প মূলধনেই শ্রেণিকৃত খামার গড়ে তোলা;
- রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি আশ্রয় ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে দুর্যোগে পশুপালন ভাঙচুর কম হয়।
| উপজেলা | প্রধান পালিত পশু |
|---|---|
| বরগুনা সদর | গরু, ছাগল |
| পাথরঘাটা | গরু, মহিষ |
| আমতলী | গরু, ভেড়া |
| তালতলী | ছাগল, ভেড়া |
অর্থনীতির দিক থেকে দেখা যায়, পশুপালনের সঙ্গে কৃষি ও কৃষি-উপজাত শিল্প যুক্ত হলে সাপ্লাই চেইন তৈরি হয়—পশুখাদ্য থেকে শুরু করে পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও স্থানীয় বাজার পর্যন্ত। এমন এক সম্ভাব্য চেইন গড়ে উঠলে গ্রামীণ নারীরা বাড়তি আয় করতে পারবে এবং নবীন তরুণদের স্বকর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শেষ পর্যন্ত বরগুনায় গবাদিপশুপালন সফল করতে হলে স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কৃষক সংগঠনকে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করলে এই খাত জেলা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভগ্নাংশ থেকে পূর্ণাঙ্গ চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে পারে।